পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে সরাসরি না হলেও ঘুরপথে জড়িয়ে পড়ল ভারত। গোলাবারুদ নিয়ে ভারতবাসীকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে না বটে, তবে রান্নাঘরে হাঁড়ি চড়ানো নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের যাবতীয় আশ্বাস সত্ত্বেও রান্নার গ্যাসের সংকট (LPG Disaster India) ক্রমশ ভয়াবহ হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালীতে (Hormuz Strait) নিষেধাজ্ঞার জেরে ভারতে গেরস্থের হেঁশেল থেকে মা ক্যান্টিন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরোটা, মিষ্টির দোকান, এমনকি মন্দিরে ভোগের রান্নাঘর- সর্বত্র কোপ পড়ছে।
বাদ যাচ্ছে না বিয়ে, অন্নপ্রাশনের মতো অনুষ্ঠানবাড়ির মেনুকার্ড। স্কুলের মিড-ডে মিল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেল, হাসপাতালে রোগীদের খাবার- সর্বত্র কাটছাঁট চলছে। বিপাকে ক্লাউড কিচেনগুলি। ফলে ফুড ডেলিভারি সংস্থার কর্মীদের আয়েও কোপ পড়ছে। পরোক্ষে অনেক মানুষের জীবিকার সংকট শুরু হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্র রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বুকিংয়ে শহরাঞ্চলে ২৫ এবং গ্রামাঞ্চলে ৪৫ দিনের ব্যবধানের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। বুকিংয়ের দুই থেকে আড়াই দিনের মধ্যে সিলিন্ডার মেলার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এলপিজি সংকটকে ঘিরে শুরু হয়েছে চরম অস্থিরতা। যদিও কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী লোকসভায় দাবি করেছেন, দেশে জ্বালানির সংকট নেই। পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন, এলপিজি- সবই নাকি পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত।
এই দাবির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী শিবির থেকে সাধারণ মানুষ। সংকট যদি না-ই থাকে, তাহলে কেন অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের আওতায় আনা হয়েছে রান্নার গ্যাসকে? কেনই বা বুকিং সত্ত্বেও সিলিন্ডারের অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসে থাকছেন সাধারণ গ্রাহক? কেনই বা গ্যাসের ডিলারদের দোরগোড়ায় সাধারণ মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে? কার্যত এসব প্রশ্নের উত্তর নেই।
গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো সিলিন্ডার নিয়ে কালোবাজারি, বেআইনি মজুতদারি। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার এর মোকাবিলায় কঠোর বার্তা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে হয়রানি কমছে না। ২ সপ্তাহ পার হলেও ইরান বনাম আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধের তীব্রতা না কমায় জ্বালানি ক্ষেত্রে এখন অশনিসংকেত ভারত সহ গোটা বিশ্বে।
সরকারের যুক্তি, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে আগাম বুকিং করছেন বলে সংকট তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই যুক্তি ধোপে টেকে কি না, সংশয় রয়েছে। এদেশে লাইনে দাঁড়ানো যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কখনও নোটবন্দির ঝক্কি সামলাতে, কখনও আধার-প্যান সংযোগের তাগিদে, আবার কখনও অতিমারির টিকা পেতে। সম্প্রতি এসআইআর-এও লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষকে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হয়েছে।
লাইনে দাঁড়ানোর তালিকায় নতুন সংযোজন রান্নার গ্যাস। বিরোধীদের অভিযোগ, লাইনে দাঁড় করিয়ে মানুষকে হেনস্তা করা হচ্ছে। একদিকে সিলিন্ডারের আকাশছোঁয়া দাম, অন্যদিকে জোগানের ঘাটতি- এই দ্বিমুখী চাপে বলির পাঁঠা হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বহু ক্ষেত্রে মানুষ নির্ধারিত মূল্যের থেকে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অথবা বিকল্প জ্বালানির খোঁজ করতে হচ্ছে।
এই সংকটের সময় সরকারের প্রধান কাজ, দেশবাসীকে সঠিক তথ্য পরিবেশন। কিন্তু গোটা পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কার্যত নীরব এবং তাঁর সরকার একপ্রকার নীতিপঙ্গুত্বে ভুগছে। রান্নার গ্যাস মানুষের একটি মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে। ম্যানমেড সংকট হোক বা অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষকে বারবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। চূড়ান্ত হয়রানির এই পর্ব আর কতদিন চলবে, সেটাও অনিশ্চিত।
শুধু পরিসংখ্যানের জাদুকরি দেখিয়ে বা ‘প্যানিক বুকিং’-এর দোহাই দিয়ে এই সংকট থেকে মুক্তির দিশা মিলবে না। যুদ্ধ বাধলে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হবে- সেটা কেন্দ্রের অজানা ছিল বললে ভুল হবে। ফলে আগেভাগে কেন বিকল্প উত্স খুঁজে রাখা হল না সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যুদ্ধের জুজু দেখিয়ে সরকার হাত উলটে ফেলতে পারে না।
