শমিত বিশ্বাস
অনুবাদ সাহিত্যকে ঘিরে এক ধরনের অতিরিক্ত আবেগ ও অযথা মহিমাকরণ আজকাল চোখে পড়ছে। বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে অনুবাদের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু সেই গুরুত্বকে ঢাল করে অনুবাদ সাহিত্যকে মূল সাহিত্যের সমতুল্য বলে প্রচার করা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। এই জায়গায় স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া জরুরি।
ভাষা কখনোই নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি ভাষা তার সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাপনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। ফলে এক ভাষায় রচিত সাহিত্য অন্য ভাষায় স্থানান্তরিত হলে তার অভিজ্ঞতার কাঠামো বদলাতে বাধ্য। শব্দান্তর সম্ভব, অনুভবান্তর নয়। এই বাস্তবতা অস্বীকার করেই অনুবাদকে প্রায়শই ‘মূলের সমান’ বলে দাবি করা হয়—যা পাঠকের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।
অনুবাদ সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা আছে, কিন্তু তার সীমাবদ্ধতাও সমান বাস্তব। যে সাহিত্য নির্দিষ্ট ভূগোল, জলবায়ু, সামাজিক সম্পর্ক ও ভাষিক অভ্যাস থেকে জন্ম নেয়, তাকে অন্য ভাষায় এনে সেই একই অনুভব অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব নয়। এখানে অনুবাদকের দক্ষতা প্রশ্নের বাইরে—সমস্যাটি কাঠামোগত। ভাষার নিজস্ব গণ্ডি পেরিয়ে অভিজ্ঞতা হুবহু স্থানান্তর করা যায় না।
এই সীমাবদ্ধতাকে অনেক সময় অনুবাদের ‘ত্রুটি’ বলে দেখানো হয়, আবার উলটো দিক থেকে কেউ কেউ একে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। বাস্তবতা হল—অনুবাদ না ব্যর্থতা, না পূর্ণ প্রতিফলন। অনুবাদ আসলে এক ধরনের রূপান্তর, যেখানে মূল রচনার সঙ্গে অনুবাদকের ভাষাবোধ, সামাজিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি মিশে যায়। ফলে অনুবাদ সাহিত্য অবধারিতভাবেই একটি পৃথক সাহিত্যরীতি তৈরি করে। এই পৃথক সাহিত্যরীতির নিজস্ব মূল্য আছে, পাঠযোগ্যতাও আছে। কিন্তু সেই মূল্যায়ন হতে হবে তার সীমা মেনে। অনুবাদকে যদি মৌলিক সাহিত্যচর্চার বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়, তবে ধীরে ধীরে পাঠকের ভাষাশিক্ষা, ভাষা-অনুশীলন এবং নিজস্ব সাহিত্যভাষার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে সাংস্কৃতিক দারিদ্র্য ডেকে আনে।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই পৃথক সাহিত্যরীতিকে মূল সাহিত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়। এতে মূল ভাষার সাহিত্যচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার পাঠকও বিভ্রান্ত হন। পাঠকের মনে যদি এই ধারণা জন্মায় যে অনুবাদ পড়লেই মূল সাহিত্য পাঠ সম্পূর্ণ হয়ে গেল, তবে সেটি বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ তাতে ভাষার গুরুত্ব, সংস্কৃতির ভূমিকা এবং সাহিত্যিক বহুত্ব—এই তিনটিই খাটো হয়ে যায়।
অনুবাদক এখানে কেবল সেতুবন্ধন রচনা করেন—তিনি মূল লেখক ও ভিন্ন ভাষার পাঠকের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এই সেতু প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেতুকে গন্তব্য ভেবে নেওয়া ভুল। একই মূল রচনার একাধিক অনুবাদ থাকা এই সত্যটিই প্রমাণ করে যে অনুবাদ কখনোই চূড়ান্ত নয়, বরং ব্যাখ্যামাত্র।
বিশ্বায়নের যুগে অনুবাদ অপরিহার্য। কিন্তু সেই অপরিহার্যতাকে কেন্দ্র করে যদি ভাষাগত পার্থক্য, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং মূল সাহিত্যের অধিকার অস্বীকার করা হয়, তবে তা সাহিত্যচর্চাকে দুর্বল করে। অনুবাদ সাহিত্যকে তার যথাযথ জায়গায় রাখা জরুরি—না অবহেলা করে, না অতিরিক্ত মহিমান্বিত করে। সুতরাং অনুবাদ সাহিত্যকে ত্রুটিপূর্ণ বলে বাতিল করা যেমন ভুল, তেমনি তাকে মূল সাহিত্যের সমকক্ষ বলে প্রতিষ্ঠা করাও সমান বিভ্রান্তিকর। অনুবাদ এক প্রয়োজনীয় কিন্তু সীমাবদ্ধ সাহিত্যিক অনুশীলন—এই বাস্তবতা স্বীকার করাই পরিণত সাহিত্যবোধের পরিচয়।
(লেখক অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)
