‘সেক্রেড গ্রোভ’ ও ‘পিবিআর’ সংরক্ষণের মাধ্যমে আমরা শুধু বনাঞ্চলের স্থানিক জীববৈচিত্র, প্রকৃতি ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারি না– এ দুইয়ের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয় লৌকিক ইতিহাসের স্মৃতিকণাও। লিখছেন উৎপল অধিকারী।
মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক পৃথিবীর ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে প্রকৃতিকে শুধুমাত্র ‘সম্পদ’ হিসাবে নয়, বরং ‘দেবতাস্বরূপ’ বা ‘জীবনের অংশ’ রূপে দেখা হয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রকৃতি পূজার এই ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। সেই ঐতিহ্যেরই দুই গুরুত্বপূর্ণ দিক হল: ‘জনজীব বৈচিত্র নথি’ ও ‘পবিত্র বনাঞ্চল’। একদিকে ‘জনজীব বৈচিত্র নথি’ মানুষের জীবন, জীববৈচিত্র ও লোকজ জ্ঞানের লিখিত দলিল। অন্যদিকে ‘সেক্রেড গ্রোভ’ হল ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসের মাধ্যমে সংরক্ষিত পবিত্র বনাঞ্চল। এই দুই ধারণাই আধুনিক পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:
‘পিবিআর’ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জীববৈচিত্র, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত জ্ঞান সম্পর্কিত তথ্যভাণ্ডার। এতে সেই অঞ্চলের উদ্ভিদ, প্রাণী, কৃষিজ ফসল, ভেষজ উদ্ভিদ, জলাশয়, বনজ সম্পদ এবং মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কিত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। ভারতের ‘বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি অ্যাক্ট, ২০০২’ অনুযায়ী, প্রতিটি স্থানীয় প্রশাসনিক এলাকায় ‘বায়োডাইভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ (বিএমসি’) গঠন করে এই নথি তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য: জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, লোকজ জ্ঞানের সুরক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি, জীবসম্পদের ন্যায্য ব্যবহার ইত্যাদি। একটি অঞ্চলের কোন কোন উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে, তাদের অবস্থা কী তা জানা থাকলে সেগুলি রক্ষার পরিকল্পনা করা সহজ হয়। এছাড়া, গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসা, কৃষিকৌশল, বন-ব্যবহারের নিয়ম ইত্যাদি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে এসেছে।
এই জ্ঞান তথা লোকজ জ্ঞান সংরক্ষণ করাও অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে, স্থানীয় মানুষ নিজের এলাকার প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারে এবং তারা আরও বেশি করে তা সংরক্ষণে আগ্রহী হয়। এই জীব সম্পদ বা লোকজ জ্ঞান ব্যবহার করে কেউ যাতে অন্যায়ভাবে লাভবান না হয়, তা নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট নথিতে। ‘পিবিআর’-এ সাধারণত স্থানীয় গাছপালা ও বনজ উদ্ভিদ; মাছ, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী ও সরীসৃপ, কৃষিজ ফসল ও দেশি বীজ, ভেষজ উদ্ভিদ ও লোকজ চিকিৎসা; নদী, পুকুর, জলাভূমি ও পরিবেশগত সমস্যা: উৎসব, লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাত্রা ইত্যাদি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হয়ে থাকে। গবেষক বা বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে; গ্রামের বা শহরের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের থেকে এই জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকেন। প্রসঙ্গত, আমি নিজে পূর্ব এবং পশ্চিম বর্ধমানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে পশ্চিমবঙ্গ বায়োডাইভারসিটি বোর্ডের তত্ত্বাবধানে অসংখ্য জীববৈচিত্র নথি তৈরি করেছি।
‘সোক্রেড গ্রোভ’ হল এমন বনাঞ্চল, যা স্থানীয় মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক প্রথা বা দেবতার প্রতি শ্রদ্ধাবশত সংরক্ষণ করে। এই বনকে সাধারণত ‘দেবতার আবাস’ বলে মনে করা হয়। তাই সেখানে গাছ কাটা, শিকার করা বা বন ধ্বংস করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পবিত্র বন বহু শতাব্দী ধরে সংরক্ষিত। এগুলি প্রকৃতির এক অসাধারণ রক্ষাকবচ। বহু বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল এই বনাঞ্চলগুলি সাধারণত মানুষের হস্তক্ষেপমুক্ত থাকে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত এই পবিত্র স্থানগুলি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, জলাধার ও মাটির উর্বরতা সংরক্ষণে সাহায্য করে।
ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই পবিত্র বনাঞ্চলের ঐতিহ্য রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে ‘জাহের থান’, ‘গ্রামঠাকুরের বন’ বা ‘শালবন দেবস্থান’, ‘বনবিবির থান’, কবরস্থান ও কোনও কোনও শ্মশান বা মন্দির-মসজিদ ইত্যাদি সংলগ্ন অঞ্চলে এই বনগুলি দেখা যায়। পূর্ব বর্ধমানে ক্ষীরগ্রামে যোগাদ্যা দেবীর মন্দির সংলগ্ন একটি বিরাট পুকুর রয়েছে। ধর্মীয়ভাবে সেটি উল্লেখযোগ্য। তাই সাধারণ মানুষ সেখানে মাছ ধরে না। এই বিরাট পুকুরে তাই প্রচুর জীববৈচিত্রের সন্ধান মেলে। বলগোনা অঞ্চলের ঢেঁড়িয়া গ্রামে ‘মহাপ্রভুর থান’ বলে এক পবিত্র স্থান দেখা যায়, যেখানে অসংখ্য গাছগাছালি রয়েছে। স্থানের ধর্মীয় মাহাত্ম্য হেতুই সেখানকার গাছপালা কাটা হয় না। জামালপুরের আঝাপুর এবং মেমারির কেন্না এই দুই গ্রামের মাঝে একটি কবরস্থান আছে, সেখানেও রয়েছে প্রায় শত বছরের পুরনো এক বটগাছ। এটিও পবিত্র স্থান হওয়া বটগাছটি অনাঘ্রাত।
মেঘালয়ের খাসি ও জয়ন্তী জনগোষ্ঠীর পবিত্র বন পৃথিবীখ্যাত। সেখানে বহু বিরল অর্কিড ও ঔষধি উদ্ভিদ পাওয়া যায়। রাজস্থানের বিশনোই সম্প্রদায় প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য সুপরিচিত। তারা গাছ ও বন্যপ্রাণীকে ধর্মীয়ভাবে রক্ষা করে, অর্থাৎ ধর্ম প্রাকৃতিকভাবেই জীববৈচিত্রকে ধারণ করে থাকে। দক্ষিণ ভারতে ‘কাভু’ নামের ‘সেক্রেড গ্রোভ’-টি এখনও সংরক্ষিত। গ্রামগঞ্জ এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে খুঁজলে এইরকম অগণিত ‘পবিত্র স্থান’ বা ‘সেক্রেড গ্রোভ’ দেখতে পাওয়া যায় যা প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর জীববৈচিত্র ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বছরের পর বছর ধরে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পাখির সংখ্যা সেখানে অনেক বেশি। বহু বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও প্রাণী আশ্রযস্থল এগুলো। কিছু ক্ষেত্রে আবার স্থানীয় জীববৈচিত্রের শেষ নিরাপদ আশ্রয়।
‘সেক্রেড গ্রোভ’ আদতেই মানুষকে শেখায় যে প্রকৃতিকে সম্মান করলে প্রকৃতিও মানুষকে রক্ষা করে। ‘জনজীব বৈচিত্র নথি’ এবং ‘পবিত্র বনাঞ্চল’ একে-অপরের পরিপূরক। সেক্রেড গ্রোভে যে জীববৈচিত্র সংরক্ষিত, তার বিস্তারিত তথ্য পিবিআর-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণীর তথ্য সংরক্ষিত হয়। এ থেকে লোকজ ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্ব বোঝা যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেই ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে ও পরিবেশ রক্ষার স্থানীয় বিষয়বস্তু নথিভুক্ত হয়। স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বললে– ‘সোক্রেড গ্রোভ’ হল বাস্তব সংরক্ষণ, আর পিবিআর হল তার সরকারিভাবে লিখিত সংস্করণ। সংরক্ষণও।
বর্তমান আধুনিক সভ্যতা প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও প্রকৃতির সঙ্গে সেই আত্মিক সম্পর্ক অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছে। ফলে, পরিবেশ সংকট ক্রমাগত বাড়ছে। ‘জনজীব বৈচিত্র নথি’ সেই হারিয়ে যাওয়া লোকজ জ্ঞানকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ করে দেয়। এই নথিকে পরিপুষ্ট করতে প্রয়োজন ‘সেক্রেড গ্রোভ’-এর
প্রতি তথাকথিত ‘আধুনিকমনস্ক’দের দৃষ্টি বদলানো। তাদের বোঝা উচিত, ‘সেক্রেড গ্রোভ’ বা পবিত্র বনাঞ্চলের গুণমাহাত্ম্য লৌকিক-অলৌকিক বিশ্বাস-অন্ধবিশ্বাসের থেকে অনেক উঁচুতে। এই বনাঞ্চল আমাদের শেখায়– পরিবেশ রক্ষার জন্য কেবল আইন নয়, মানুষের প্রাচীন বিশ্বাস ও সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। আদিবাসী ও গ্রামীণ সমাজ প্রকৃতিকে রক্ষাকর্তা বা দেবতা হিসাবে দেখেছে। তাই তারা তারা তা ধ্বংস না করে রক্ষা করে আসছে, উপাসনার মাধ্যমে। এই ‘উপাসনা’ আর যা-ই হোক, ‘আধুনিক’দের উপাসনা-সংক্রান্ত বদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির অনেক উপরে। এই মুহূর্তে পৃথিবী যখন জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় ও জীববৈচিত্র ধ্বংসের সংকটে আক্রান্ত,
তখন এই লোকজ ঐতিহ্য আমাদের প্রকৃতি সংরক্ষণের নতুন পথ দেখাতে পারে। এর রক্ষার্থে কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয়েই হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে, ঠিকই, তবে বাজেট ও রাজনৈতিক দলের ইস্তাহারে পরিবেশ নিয়ে আরও বিশদ আলোচনা করার প্রয়োজন।
(মতামত নিজস্ব)
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
