অণুগল্প

অণুগল্প

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


সৈয়দের সততা

ইথার নাগ

সুয়েজ ক্যানালে জাহাজ এসে পড়ল। ক্যানাল পার করতে তেরো-চোদ্দো ঘণ্টা লাগবে। ধীরগতিতে সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে এক এক করে জাহাজ পার হচ্ছে। জাহাজের ক্যাপ্টেনকে সাহায্য করতে একজন অফিসার এসেছেন। জাহাজের ভাষায় তাকে পাইলট বলা হয়। তিনি সৈয়দ বন্দরে জাহাজ নিয়ে এলেন।

বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে এই প্রথম বিদেশযাত্রা সংযুক্তার। ওর স্বামী মার্চেন্ট নেভির অফিসার। দুপুরে খাবার সময় হলে সেলুনে (খাবার জায়গা) সংযুক্তা যখন খেতে এসেছে, তখন নীচে নাবিকদের কেবিনের দিক থেকে প্রচণ্ড শোরগোল শোনা যাচ্ছে। স্টুয়ার্ডদের জিজ্ঞেস করে ও জানতে পারল, সৈয়দ বন্দরের ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা জাহাজ বন্দরে ভিড়লেই জাহাজে উঠে এসে নাবিকদের কেবিনের সামনে জায়গা দখল করে রকমারি জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে যায়। তাদের সেই অস্থায়ী দোকানে থাকে পারফিউম, ঘর সাজানোর শৌখিন দ্রব্য, ছোট ছোট ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র, হাল ফ্যাশনের পোশাক, জুতো ইত্যাদি। শুনে খুব উৎসাহিত হয়ে উঠল সংযুক্তা। এরকম দুয়ারে গড়িয়াহাট গোছের অভিজ্ঞতা জাহাজে এসে হবে ও ভাবতে পারেনি। স্টুয়ার্ডরা অবশ্য আরও সাবধান করে দিয়েছিল, কেবিন কিন্তু এ সময় তালা মেরে রাখবেন। না হলে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই পর্যন্ত শুনে সংযুক্তা খাওয়া শেষ না করেই, পড়িমরি করে নীচে নেমে আসছে, তখনই একজন মিশরীয় দোকানি এসে সবাইকে বলে গেলেন, একজন অফিসারের কেবিনের দরজা কিন্তু খোলা আছে। সংযুক্তা বুঝতে পারল তার কেবিনের কথাই উনি বলছেন। স্বামীকে ও ধন্যবাদ জানাতে বলল সেই দোকানিকে। সৎ মানুষ সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে আছে। জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দেবার অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন দেশে এসে নতুন মানুষের সততার অভিজ্ঞতাও যুক্ত হল সংযুক্তার প্রাপ্তির ঝুলিতে।

ভবঘুরে

গোবিন্দ সরকার

লালনগীতি গেয়ে শ্রোতা হাতড়াচ্ছে এক ভবঘুরে। মানুষের ভিড় লক্ষ করে গান গায়। কিন্তু তার ছাই মাখা শরীর, উশকোখুশকো ঝাঁকড়া চুল, খুশকি ওঠা চাপদাড়ি আর পরনে ছেঁড়া ময়লা জামাকাপড় দেখে ভিড় ক্রমশ পাতলা হয়ে যায়। তবুও গায়,

    ‘এই বেলা তোর ঘরের খবর জেনে নে রে মন।

    কেবা জাগে কেবা ঘুমায় কে কারে দেখায় স্বপন।।’

কী দারুণ তার কণ্ঠ! কণ্ঠে এক মোহময়ী জাদু। কণ্ঠের মদিরতায় বুঁদ হয়ে যায় মানস মন। বারেবারে গায়ের লোম ভাইব্রেট দিয়ে ওঠে। তবুও সে শ্রোতা টানতে ব্যর্থ।

একদিন রাস্তায় এক ভদ্রলোককে তার কাতর অনুরোধ, ‘এই শুনুন না একটি গান!’

— ‘কে আপনি?’ ভদ্রলোক খেঁকিয়ে ওঠে।

— ‘শিল্পী।’

— ‘না না আমার সময় নেই।’

— ‘ঘরসংসার করিনি জানেন। গানেতে উৎসর্গ করেছি জীবন। গলাটা উশখুশ করছে। শুনুন না? শুনেই দেখুন একবার!’

      ‘কেবা জাগে কেবা ঘুমায় কে কারে দেখায় স্বপন।

      এই বেলা তোর ঘরের খবর জেনে নে রে মন।।’

আস্ত পাগল, ভিখিরি ভেবে ভদ্রলোক দশটি টাকা দিয়ে হনহন করে হাঁটা দেয়। কিছুদূর যাওয়ার পরেই ভবঘুরে পেছনদিক থেকে তার হাত টেনে ধরে। হাতে টাকা ফেরত দিয়ে বলল, ‘আমার টাকার প্রয়োজন নেই বুইলেন। শ্রোতার প্রয়োজন।’

ভবঘুরে মোটেও এমন পরিস্থিতি আশা করেনি। এত এত আঘাতের সমারোহে হতাশার বুদবুদ তার মনে চাগাড় দিয়ে ওঠে। প্রগতিশীল সমাজ থেকে আবার সে নিজেকে সরিয়ে নিল। এভাবে বারবার সে নিজেকে একা করে। আর জাবর কাটে জগতের সমস্ত উপহাস।

The publish অণুগল্প appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *