শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় নজরুলকে উপেক্ষা

শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় নজরুলকে উপেক্ষা

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


বড় নিঃশব্দেই চলে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। শুধু মুসলিম বলেই কি এই উপেক্ষা? উপেক্ষিত নজরুলগীতিও।

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

সনজিদা খাতুন বা কলিম শরাফি কেউই নেই আর ঢাকায়। তবু ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে গিয়েছে বোধিবৃক্ষের মতো। যেখানে আক্রমণ হলেও, সংগীতের সব যন্ত্র ধ্বংস করে দিলেও তাঁদের উত্তরসূরিরা রাস্তায় নেমে ধরেন রবীন্দ্রগান, গেয়ে ওঠেন নজরুলসংগীত। নববর্ষের মায়াময় অনুষ্ঠান হয়তো শুরুই করেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের গান দিয়ে। সমস্ত ধর্মীয় বন্ধন তুচ্ছ করে।

এসব কথা মাথায় আসে আমাদের এই বাংলায় নজরুলের জন্মদিন সম্পূর্ণ নীরবেই চলে যাওয়ার পর। সরকারিভাবে এবার রবীন্দ্রসদনে রবীন্দ্র জন্মোৎসবই পালন হয়নি, সেদিন ছিল নতুন সরকারের শপথগ্রহণ। সেক্ষেত্রে সরকার যে ধুমধাম করে নজরুলের জন্মোৎসব পালন করবে সেই প্রত্যাশাটা কি অত্যন্ত বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? তবু এতটা উপেক্ষা কি নজরুলের প্রাপ্য ছিল?

কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের একজনও মুসলিম এমপি নেই। মন্ত্রী দূরে থাক। রাজ্যের বিজেপি সরকারের একজন মুসলিম বিধায়কও নেই। এই প্রেক্ষাপটে নজরুল যে পদ্মগন্ধী বাংলায় উপেক্ষিত থেকে গেলেন তাতে কোনও অপ্রত্যাশিত চমক নেই। বরং এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। অত্যন্ত লজ্জার হলেও প্রত্যাশিতই কিছুটা।

পদ্মার ওপারে যখন মৌলবাদী জামায়াতে নেতা-কর্মীরা কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথকে হেয় করে, রবীন্দ্রনাথের সততা এবং অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন আমরা এপারে বসে জ্বালাময়ী প্রতিবাদ করি। ওপারের বাঙালির মানসিকতা নিয়ে আক্রমণ করি। এখন আমাদের এখানে নজরুলকে উপেক্ষা নিয়ে ওপার বাংলায় যদি কটাক্ষ হয়, কড়া সমালোচনা হয়, আমাদের কিছু বলার নেই।

বাম আমলে একটা সময় রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত সন্ধ্যা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল বাংলার বিভিন্ন শহরে। পাড়ায় পাড়ায় বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে একটা অনুষ্ঠান হতই তিন সাহিত্যিককে স্মরণে রেখে। অনেকে মজা করে অনুষ্ঠানটাকে বলতেন রসুন। রসুন থেকে সু কমে যেতে লাগল তৃণমূল জমানায়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাকাকে বামেরা যেভাবে শ্রদ্ধা জানাত, তৃণমূল তা জানাত না। সুকান্তর জন্য বরাদ্দ রইল উপেক্ষা। রসুন থেকে ন খসে রইল রন। এবার বিজেপি জমানায় ন খসে যাওয়ার অবস্থা।

সরকারি উদ্যোগে নজরুল স্মরণ বা নজরুল উপেক্ষা প্রসঙ্গ সরিয়ে রাখা যাক। আমরা আমবাঙালিরা কি নজরুলকে বুকের মধ্যে রাখতে পেরেছি আগের মতো? অসম থেকে এসে এক অসমিয়া গায়ক একটি গানে বাঙালিকে মাতিয়েছিলেন একদা। ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল।’ আর চেতনা! এখনকার বাঙালি ‘একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান’ এই লাইনটি নিয়ে ব্যঙ্গ করা লজ্জাহীন মানুষজনকে মাথায় করে রাখে। ভাবে, কেমন দিয়েছি!

একটা সময় বাংলার যে কোনও সকালে যে কোনও পাড়া দিয়ে হেঁটে গেলে কিশোরীদের গলা সাধার আওয়াজ শোনা যেত এবং সেই গলা সাধায় অনিবার্যভাবে উপস্থিত থাকত রবীন্দ্রসংগীত এবং নজরুলগীতি। এক-একটা নজরুলগীতি তখন বাঙালির বুকের মধ্যে বসে থাকত। প্রচুর অভিভাবক রবীন্দ্রসংগীতের বদলে নজরুলগীতি পছন্দ করতেন। ছেলেমেয়েরা নজরুলগীতি গাইলেই খুশি হতেন বেশি, সেই গানের ক্ল্যাসিকাল স্টাইল পছন্দ ছিল বলে। সেই দিনগুলো ফিরে আর আসবে না কখনও।

নজরুলগীতির সোনার দিনগুলোও শেষ হয়ে গিয়েছে এই বাংলায়। কতজন নজরুল গবেষককেই বা পাবেন এখন!

একদা পাড়ার ফাংশনে শুধু নজরুলগীতি গাইতেন অনেকে। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় নজরুলগীতির জনপ্রিয়তাকে অন্য ধরনের মাত্রা দিয়েছিলেন। মানবেন্দ্রর পাশাপাশি ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, ধীরেন বসু, পূরবী দত্ত, অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়রা শুধু নজরুলগীতি গাওয়ার জন্যই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন। তারও আগে ছিলেন ইন্দুবালা, আঙুরবালা। পরে কিছুটা অনুপ ঘোষাল। সেরকম শুধু নজরুলগীতি স্পেশালিস্ট পাওয়া এখন মুশকিল কলকাতায়। পুরো বাংলাতেই। খেয়াল করে দেখুন, শুধুই রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার লোকও আজকের দিনে হাতেগোনা।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এক বড় সমস্যা। এর একটি পরোক্ষ প্রভাব নজরুলের মূল্যায়নেও পড়ছে। আমি হিন্দুত্ববাদী, আমার নজরুলকে শ্রদ্ধা করলে তো জাত চলে যাবে! নজরুল আমার সিলেবাসের বাইরেই। ব্যতিক্রম কিছু থাকতে পারে। কয়েকজন দাবি করতে পারেন, হিন্দুত্ববাদী হলেও আমরা পাড়ায় এক নজরুল স্মরণ সন্ধ্যা করেছি। তবে সামগ্রিক ছবিটা পুরোটাই লজ্জার। এতদিনেও আমরা নজরুলের নির্দিষ্ট জন্মতারিখ ঠিক করতে পারিনি। একজন বাংলা মতে তারিখ ধরছি, একদল ইংরেজি মতে।

একদল মানুষ তাঁকে শুধুই ‘ইসলামি গানের রচয়িতা’ হিসেবে দেগে দিতে চান, আবার অন্য দল তাঁর শ্যামাসংগীত বা হিন্দু পুরাণের ব্যবহারকে সামনে রেখে তাঁর খণ্ডিত বিচার করেন। নজরুল যে একইসঙ্গে মানুষের জয়গান গেয়েছেন এবং জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে সাম্যের কথা বলেছেন, সেই অখণ্ড সত্তাটি হারিয়ে যাচ্ছে। দুই বাংলায় এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বললেও অনেক শিক্ষিত অশিক্ষিতের মতো গালাগাল দিচ্ছেন। এখানে তো নজরুল উপেক্ষা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে যাচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী বা রবীন্দ্রভারতীর মতো নজরুলকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমানের গবেষণার খরা স্পষ্ট। যদিও আসানসোলে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, তবুও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নজরুলের সাহিত্য এবং রাজনৈতিক চিন্তার গভীর বিশ্লেষণ নিয়ে বড় মাপের কাজ কম হচ্ছে। বাংলাদেশে নজরুলকে নিয়ে যে ধরনের রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক আবেগ কাজ করে, পশ্চিমবঙ্গে তার অভাব।

বাংলাদেশেও ছবিটা যে দারুণ কিছু আলো ছড়ানোর, তেমন নয়। তিনি সেখানে জাতীয় কবির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান গতবছর ২ জানুয়ারি। ১৯৭২ সালের ৪ মে থেকে তাঁকে জাতীয় কবি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন করা হয়েছিল। তাতে সরকারি সিলমোহর পড়ল এত যুগ পরে।

আরও যন্ত্রণার, নজরুলের সমাধিস্থলের পাশে সমাহিত করা হয় বিতর্কিত নেতা ওসমান বিন হাদিকে। কেন নজরুলের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হল? উত্তরটা অতি সহজ। ওই সময় সরকার যাঁরা চালাচ্ছিলেন, তাঁরা ছিলেন হাদির প্রতি সহানুভূতিশীল। হাদি ছিলেন তাঁদের চোখে হিরো। ভবিষ্যতে আবার হয়তো কেউ মারা গেল, যে তখনকার সরকারের চোখে নায়ক—তাকেও নজরুলের পাশে সমাহিত করে দেওয়া হতে পারে।

নজরুল শুধু এক সময়ের ‘বিদ্রোহী কবি’ ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাতপাতহীন মুক্ত সমাজের আজীবন এক সৈনিক। তাঁর গুরুত্ব কমছে কারণ সমাজ আজ তাঁর দেখানো আপসহীন প্রতিবাদের পথ থেকে দূরে সরে আপসের চাদর গায়ে জড়িয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার কাজল বড় বেশি চোখে লাগিয়েছে বাঙালি।

নজরুলকে নিয়ে পদ্ম বাংলার শাসকরা বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস না দেখালেও একটা সত্যি জেনে রাখা দরকার। ১৯৪২ থেকে নজরুল যখন অসুস্থ, তখন তাঁকে সুস্থ করার যাঁরা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রথম সারিতে বিজেপির পরম আরাধ্য। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ওই সময় নেতারা কেউ রাজনীতির রং দেখতেন না এই ব্যাপারে। শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে প্রচুর ছুটোছুটি করেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়, ফজলুল হক। তিনজনে তিন মনোভাবের মানুষ। অথচ নজরুলকে চিকিৎসার জন্য অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা পাঠানোয় একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ তৈরি করেছিলেন নজরুল সাহায্য কমিটি। যার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ, সম্পাদক সজনীকান্ত দাস। সদস্যদের মধ্যে অন্যতম তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি আবার ছিলেন কংগ্রেসি নেতা।

অসুস্থ হওয়ার আগে নজরুল শ্যামাপ্রসাদকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। তাতে শ্যামাপ্রসাদের দেশপ্রেম, নির্ভীকতা ও আদর্শের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ জানিয়েছিলেন নজরুল। ১৯৪২ সালে ১০ জুলাই অসুস্থ হলেন কবি। শ্যামাপ্রসাদ তাঁকে দেখতে এলেন ক’দিন পরে। নজরুল কাঁপা হাতে লিখেছিলেন, আমার এখনই এক হাজার টাকা দরকার। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে নজরুলের জন্য ৫০০ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ধার করে। এ সব নিয়ে নানা অসত্য, অর্ধসত্য কথা এখন পল্লবিত হয়ে ঘুরে বেড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। সত্যি, মিথ্যে একাকার হয়ে যায়।

নজরুল-শ্যামাপ্রসাদের যোগাযোগের সূত্র ছিলেন সুফি জুলফিকার হায়দার। তিনি তাঁর বইয়ে শ্যামাপ্রসাদ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘কবির কাছে টাকার প্রয়োজনের কথা শুনে তিনি যে পাঁচশো টাকা অবেলায় ধার করে জোগাড় করে দিলেন, নজরুলের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি দেখাবার এই যে মহান নজির, তা আমি কার সঙ্গে তুলনা করব? কবির অসুখের দিন থেকে আমি অনেকের সঙ্গেই দেখা করেছি, সাহায্য করা দূরে থাকুক, তাঁর মতো এতখানি আগ্রহের সঙ্গে ও বিচলিত হৃদয়ে আর কে-ই বা নজরুলের অসুখের কথা শুনেছে?’

আজ যখন বাংলায় শ্যামাপ্রসাদের ভক্তদের হাতেই উপেক্ষিত হয়ে পড়ে থাকে নজরুল স্মৃতি, তখন ওই লাইনগুলো বেশি করে মনে পড়ে। শ্যামাপ্রসাদের নতুন বাংলায় নজরুলের উপেক্ষা মানায় না।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *