মালদার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোমলমতি পড়ুয়াদের সচেতন করতে পরিবার ও বিদ্যালয়ের ভূমিকা জরুরি।
তপতী গায়েন
মালদার হবিবপুরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের ধারাবাহিক যৌন নিগ্রহের সাম্প্রতিক অভিযোগ উঠেছে এবং এই অভিযোগের তদন্ত চলছে। এই অভিযোগ শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। শিশুদের আদর করা মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি হলেও এই স্নেহের আড়ালে থাকা বিকৃত ছোঁয়া সব সময় আনন্দ বয়ে আনে না। বহু ক্ষেত্রে এই অনুমোদিত স্পর্শ শৈশবের স্বাভাবিক বিকাশকে এক বিভীষিকাময় পর্বে পরিণত করে। এই ধরনের অনভিপ্রেত স্পর্শের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বুঝে ওঠার নির্দিষ্ট বয়স খুদে পড়ুয়াদের থাকে না। সেই কারণে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের নিজের শরীর এবং নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শের পার্থক্য চেনানো জরুরি হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় ভয় এবং শঙ্কার বিষয়টি হল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা এই বিকৃত লালসার শিকার হয় কোনও কাছের মানুষ বা পরিচিত কারও দ্বারা। এ ধরনের নিগ্রহ কেবল কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে এমন ধারণা সঠিক নয় কারণ বর্তমান সময়ে ছেলে শিশুরাও সমানভাবে অসুরক্ষিত। এই ঘটনা সমাজে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। অনেক সময় ভয়, লজ্জা কিংবা অপরাধবোধের কারণে শিশুরা দীর্ঘদিন ঘটনাটি কাউকে বলতে পারে না। অনেক শিশুই আবার বিশ্বাসই করতে পারে না যে পরিচিত কোনও মানুষ তার সঙ্গে অন্যায় করতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত তাদের এমন পরিবেশ দেওয়া যেখানে তারা নির্ভয়ে সব কথা বলতে পারে। পরবর্তী সময়ে যখন তারা বিষয়টি বুঝতে শেখে তখন তাদের কোমল মনে এর একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক কুপ্রভাব পড়ে।
তাই অভিভাবক হিসেবে বাড়িতে বাবা-মায়ের হাত ধরেই এই বিষয়ে প্রাথমিক পাঠদান শুরু করা জরুরি। শিশুকে শেখাতে হবে যে স্পর্শ শিশুর নিরাপত্তা, যত্ন বা প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং যাতে সে অস্বস্তি বোধ করে না সেটি সাধারণত নিরাপদ স্পর্শ। পক্ষান্তরে কোনও সংস্পর্শে শিশু যদি ভয় বা ব্যথা পায় অথবা কেউ অকারণে তার শরীরের ব্যক্তিগত অংশে হাত দেয় তবে তা অনিরাপদ স্পর্শ। চকোলেট বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে কেউ আলাদা ঘরে ডাকলে সেখানে না যাওয়া এবং অসম্মতি সত্ত্বেও বারবার স্পর্শ করলে জোরে চিৎকার করা কিংবা বড়দের জানানোর শিক্ষা দিতে হবে। পরিবারে ঠিক কোন কোন সদস্য তাকে স্নান বা পোশাক পরিবর্তন করাবে তা স্পষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যালয় হল শিশুদের দ্বিতীয় গৃহ এবং এই আলোর পথ দেখানোর ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না থেকে কোমলমতি শিশুদের ব্যবহারিক শিক্ষাদান করা উচিত। শরীরের ব্যক্তিগত অংশে অনভিপ্রেত স্পর্শ গ্রহণযোগ্য নয়, এই বোধ ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে। আবার বাবা যখন কপাল ছুঁয়ে জ্বর দেখেন কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফলের পর মা পরম স্নেহে থুতনি নেড়ে দেন, সেই স্নেহময় ও নিরাপদ স্পর্শ যে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক তাও সমান্তরালভাবে শেখাতে হবে।
শ্রেণিকক্ষে এই সংবেদনশীল বিষয়টিকে পুরোপুরি জীবন্ত করে তুলতে শিক্ষক-শিক্ষিকারা বিভিন্ন সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন এবং আকর্ষণীয় বয়সোপযোগী শিক্ষণীয় ভিডিওর সাহায্য নিতে পারেন। সাবলীল ভাষায় গল্পের ছলে কিংবা অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী, শিক্ষামূলক কার্টুন ও অ্যানিমেশন ব্যবহার করলে খুদে পড়ুয়ারা সহজেই বিষয়টি আত্মস্থ করতে পারবে। পকসো আইনের মতো কঠোর আইন থাকলেও সচেতনতাই প্রথম প্রতিরক্ষা। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শাস্তির ভয় নয়, সচেতনতা ও আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলা। শিশুর নিরাপত্তার শিক্ষা কোনও একদিনের পাঠ নয়; এটি পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। পরিবার ও বিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগই সেই ভিত্তি।
(লেখক শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলের শিক্ষক)

