ডিজিটাল যুগে অতীত ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মে পারিবারিক মূল্যবোধ জাগানো প্রয়োজন
কৌশিকরঞ্জন খাঁ
আজ থেকে চল্লিশ বছর আগের এক সকালে উত্তরবঙ্গের কোনও মফসসল শহরের ইটের রাস্তা ধরে হাঁটলে সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য ছিল বাড়ি বাড়ি থেকে উনুনের কয়লার ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে মিশে যাওয়া। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত এক চেনা ধোঁয়াটে গন্ধ। এভাবেই প্রতিদিন ঘুম ভাঙত অলস মফসসলের এবং স্কুল কিংবা অফিসে যাওয়ার তাড়াহুড়োয় গৃহিণীদের ভাতের থালা সাজানোর তোড়জোড় শুরু হত। মাসকাবারির বাজারের সঙ্গে রিকশায় চেপে আসত এক বস্তা পাথুরে কয়লা বা কোক কয়লা। বাড়ির কাঁচা রান্নাঘরের পাশে বা উঠোনের কোণে অবহেলায় পড়ে থাকা এই কালো জ্বালানিটির খোঁজ পড়ত প্রতিদিন খুব ভোরে। সে সময়ে উত্তরবঙ্গের ছোট-বড় শহরগুলোতে অন্তত দশ-বারোটি কয়লার দোকান অনায়াসেই চোখে পড়ত।
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কিশোর উপন্যাস ‘ইতি তোমার মা’-তেও কয়লা নিয়ে এক নস্টালজিক যাপন খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে বুড়ো নামের ছেলেটির বাবার আজীবন স্বপ্ন ছিল একটি কয়লার দোকান দেওয়ার এবং সেখানে বসে সারাদিন কয়লা বিক্রি করার। এলপিজি সিলিন্ডার আসার আগে বাজারে কয়লার ব্যাপক চাহিদা ছিল এবং বড় বড় মুদি দোকানেও কয়লা ও লবণ পাশাপাশি বস্তায় ভরে দোকানের বাইরে রাখা হত। মধ্যবয়সি প্রজন্মের স্মৃতির সংগ্রহশালায় এই দৃশ্য আজও উজ্জ্বল হলেও আজকের সাত-আট বছরের আধুনিক শিশুরা কয়লা চেনেই না। জনজীবনের একসময়ের এই অপরিহার্য বস্তুটি আজ উত্তর প্রজন্মের কাছে প্রায় বিস্মৃত। বর্তমান চটকদার ডিজিটাল যুগে অসংখ্য ছবি ও তথ্য মুঠোফোনে জমা হলেও পারিবারিক স্মৃতির বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য সাক্ষ্য বহন করে এই পুরোনো বস্তুগুলিই।
বাঙালি বাড়িতে কমবেশি এমন একটি ধূলিধূসরিত পরিসর থাকে যা আপাতদৃষ্টিতে বাতিল বা অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ঠাসা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’-তে গ্রামীণ পটভূমিতে অপুর পুরোনো জিনিসের প্রতি অবুঝ কৌতূহল যেন হারিয়ে যাওয়া সময়কে নতুন করে আবিষ্কারেরই এক শাশ্বত প্রতীক। বর্তমান যুগে যে সমস্ত গঞ্জ ও শহরে বহুতল ফ্ল্যাট সংস্কৃতির চূড়ান্ত দাপাদাপি শুরু হয়েছে সেখানে পুরোনো সাবেকি বাড়িঘরের সঙ্গে পরিবারের প্রাচীন স্মারকগুলোও চিরতরে হাপিস হয়ে গিয়েছে। তবে উত্তরবঙ্গের আধা শহর কিংবা আধা গ্রামের গন্ধ মাখা শান্ত এলাকাগুলোতে পারিবারিক সংগ্রহের এই অমূল্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার আজও সগৌরবে টিকে রয়েছে।
বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে ঘরদোর ঝাড়ামোছার পর বহু আগের ব্যবহৃত জিনিসপত্র যখন রোদে উঠোনে মেলে দেওয়া হয় তখন বাড়ির ছোটদের চোখে এক মায়াবী ঘোর লেগে যায়। পুরোনো সেই সাদা কালো ছবির অ্যালবাম, পূর্বপুরুষের সন্ধ্যার কীর্তনের পিতলের করতাল, কলম ও কাচের দোয়াত, কাঠের প্রাচীন ক্যাশবাক্স, রেডিও, কলের গান, রিল ক্যামেরা এবং লণ্ঠন ও হ্যাজাকের মতো সামগ্রী তখন ঘরজোড়া আলোয় নতুন রূপ পায়। এর সঙ্গেই ওজনের পুরোনো বাটখারা, কেরোসিন কুকার, তামার পয়সা কিংবা বিশেষ ঘটনার সংরক্ষিত খবরের কাগজ যেন ধুলো ঝেড়ে অতীতের এক একটি জীবন্ত সাক্ষী হয়ে ওঠে।
প্রত্যেকটি পরিবারের নিজস্ব একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য থাকে যা উপযুক্ত যত্নের অভাবে কালের নিয়মে হারিয়ে যায়। নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা অনেক সময়ই তাদের পারিবারিক গৌরবময় ধারা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে গেলেও এই বাতিল সামগ্রীগুলোই তাদের শিকড়ের অমোঘ সন্ধান দিতে পারে। এই কারণেই নামী সরকারি কিংবা নামী বেসরকারি মিউজিয়ামের কৃত্রিম গণ্ডির বাইরেও প্রতিটি সাধারণ ঘরে ছোটখাটো একটি নিজস্ব সংগ্রহশালার আবশ্যিকতা গভীরভাবে অনুভূত হয়। বাইরের কেউ না দেখুক, পরিবারের মানুষজনই একটি আলমারি কিংবা বাড়ির একটি কোণ জুড়ে এই স্মৃতির মণিকোঠা আগলে রাখলে তা উত্তরসূরিদের আত্মিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন এই আত্মিক টানই শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে সুস্থ সামাজিক কাঠামোর মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। পারিবারিক সংগ্রহশালা তাই কেবল পুরোনো জড় বস্তুর ভাণ্ডার নয়, আক্ষরিকভাবেই একটি পরিবারের আত্মপরিচয় ও উত্তরাধিকারের অমর দলিল।
(লেখক প্রাবন্ধিক। বালুরঘাটের বাসিন্দা।)

