যুদ্ধের রক্তচক্ষু-রাজনীতিতে বারবার প্রভাবিত বিশ্বকাপ! তবু জিতে গিয়েছে ফুটবল

যুদ্ধের রক্তচক্ষু-রাজনীতিতে বারবার প্রভাবিত বিশ্বকাপ! তবু জিতে গিয়েছে ফুটবল

রাজ্য/STATE
Spread the love


আবার সে এসেছে ফিরিয়া। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। বিশ্বকাপ ফুটবল। খেলছে ৪৮টা দেশ। কিন্তু গোটা বিশ্বজুড়েই চলছে উন্মাদনা। আসলে ফুটবল এমন এক খেলা, যা মনকেমনের হাওয়া বা ঝলমলে রোদ্দুরে গা ভাসানোর মতো এক চিরন্তর উপলব্ধি। বিশ্বকাপ সেই অনুভূতিকেই জড়িয়ে ধরার গল্প। অথচ এমন পবিত্র খেলাধুলোর শরীরেও আঁচড় পড়েছে যুদ্ধের। স্পর্শ করেছে বৈষম্যের রাজনীতির কুবাতাস। তবু সব ‘নেগেটিভ’ উপাদানকে উড়িয়ে জিতে গিয়েছে ফুটবল।

এবারের বিশ্বকাপ শুরুর মাসকয়েক আগেই ইরানের আকাশে মৃত্যুগোলা ছুড়তে শুরু করে আমেরিকা। সেই সংঘাত এখনও থামেনি। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ। আয়োজক আমেরিকা। অন্যতম অংশগ্রহণকারী দেশ ইরান। ফলে তেহরান আদৌ বিশ্বকাপ খেলবে কি না, তাই নিয়ে প্রশ্ন ছিল। শেষপর্যন্ত অবশ্য ইরান মাঠে নেমেছে। কিন্তু রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচাতে পারেনি। ম্যাচ খেলার পরই কার্যত ‘ঘাড়ধাক্কা’ খেতে হয়েছে। ফুটবলার এবং সাপোর্ট স্টাফদের ম্যাচের পর রিকভারির ন্যূনতম সময়টুকুও দেওয়া হয়নি। ‘বদলা’ নিতে ছাড়েনি ইরানও। গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে ইরানের মিডফিল্ডার মহম্মদ মোহেবি দু’হাত দিয়ে বন্দুকের ভঙ্গি করে দর্শকদের দিকে দেখান। এহেন সেলিব্রেশনে কীসের ইঙ্গিত ছিল তা বুঝতে অসুবিধা হয় না কারওই। আসলে যুদ্ধ ও রাজনীতির বিষবাষ্পের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া বোধহয় অসম্ভব। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সেটাই প্রমাণ করে।

আরও পড়ুন:

পবিত্র খেলাধুলোর শরীরেও আঁচড় পড়েছে যুদ্ধের। স্পর্শ করেছে বৈষম্যের রাজনীতির কুবাতাস। তবু সব ‘নেগেটিভ’ উপাদানকে উড়িয়ে জিতে গিয়েছে ফুটবল।

তবে এটা মোটেই স্রেফ সাম্প্রতিক নিদর্শন নয়। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ হয়েছিল ফ্রান্সে। সেবার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা ও ইরান। এই ম্যাচকে বলা হয় ‘মাদার অফ অল গেমস’। সেটা কিন্তু খেলার ভিত্তিতে নয়। দু’টো দেশের কেউই বিশ্বসেরা হওয়ার জন্য লড়ছিল না। কিন্তু এটার গুরুত্বই বিশ্বকাপের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবান্বিত ম্যাচ’ হিসেবে। খেলাটায় ইরান জিতে গিয়েছিল ২-১ গোলে। এই জয়ের পর কার্যতই উৎসব শুরু হয়ে যায় তেহরানে। ইরানি জনগণের ঐক্য ও শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন হিসেবেই এই জয়ের প্রচার করেছিল ইরান প্রশাসন। আসলে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে আমেরিকা ও ইরানের শত্রুতা এক অন্য মাত্রা পেতে থাকে। ক্রমশই তিক্ততা এমন আকার ধারণ করে ফুটবল মাঠের লড়াই হয়ে ওঠে রীতিমতো যুদ্ধ। বারুদের গন্ধে তেতে ওঠে চারপাশ।

সেই ১৯৩০ সাল থেকে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসছে। কিন্তু শুরু থেকেই এইভাবে যুদ্ধ ও রাজনীতি একে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াতে চেয়েছে। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইটালি। সেটা বেনিটো মুসোলিনির মতো একনায়কের আমল। তিনি সটান হেড কোচকে বললেন, কেবলমাত্র ফ্যাসিস্ট পার্টির সদস্যদেরই জাতীয় দলে নেওয়া হোক! আর খেলা চলাকালীন লিবিয়ায় গণহত্যাও ঘটিয়েছিল ইটালি। আবার ১৯৩৮ বিশ্বকাপের ঠিক আগে হিটলারের জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করে। ফলে স্বাধীন দেশ হিসেবে তারা আর বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। বরং প্রতিপক্ষ সুইডেন সরাসরি পরের রাউন্ডে ওয়াকওভার পায়। এখানেই শেষ নয়। নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়ার কয়েকজন ফুটবলারকে জোর করে জার্মান দলে খেলায়। তার আগে অস্ট্রিয়া দল থেকে সমস্ত ইহুদিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন নাৎসি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিটলার। এমন নজির আরও রয়েছে। স্রেফ রাজনীতি নয়, যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবও পড়েছিল বিশ্বকাপে। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাতিল হয়ে যায় বিশ্বকাপ। কারণ বিশ্বব্যাপী সংকটের মধ্যে খেলার আয়োজন ও তাতে অংশগ্রহণ পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ১৯৪৬ সালেও একই পরিস্থিতি ছিল। যদিও যুদ্ধ শেষ হয়েছে আগের বছর। তবু যুদ্ধের প্রভাবের কারণে চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ তখনও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

বিশ্বকাপ শুরুর মাসকয়েক আগেই ইরানের আকাশে মৃত্যুগোলা ছুড়তে শুরু করে আমেরিকা। সেই সংঘাত এখনও থামেনি। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ। আয়োজক আমেরিকা। অন্যতম অংশগ্রহণকারী দেশ ইরান।

১৯৫৮ বিশ্বকাপে ইজরায়েলের সঙ্গে খেলতে অস্বীকার করে মিশর, সুদানের মতো দেশ। কারণটা স্রেফ রাজনৈতিকই। ২০০৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ছিল জার্মানি। প্রতিযোগিতা চলাকালীন নিও-নাৎসি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে অভিযোগ উঠেছিল স্টেডিয়াম তৈরি করতে নাকি ক্রীতদাসদের কাজে লাগানো হয়। দর্শকদের রামধনু আর্মব্যান্ড পরতে বারণ করা হয়। কারণ সেদেশে সমকামিতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বলে রাখা যাক, একই বিতর্ক এবারও দেখা গিয়েছে। যদিও আমেরিকায় সমকামিতা নিয়ে স্বাধীনতা আছে। কিন্তু এতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে মিশর ও ইরান। যদিও দর্শকদের রামধনু পতাকা নিয়ে স্টেডিয়ামে ঢোকার অনুমতি দিয়েছে ফিফা। তবু বিষয়টা নিয়ে তর্ক চলছেই।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এমন নিদর্শনও রয়েছে, আয়োজক দেশ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছে দেশজুড়ে অস্থিরতার কারণেই। দেশটার নাম কলম্বিয়া। ঠিক ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপ তারাই আয়োজন করবে। কিন্তু ১৯৮২ সালে তারা প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়। আসলে সেদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় বিশ্বকাপ আয়োজন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফিফার প্রতিনিধিরাও তাদের সরে আসতে চাপ প্রয়োগ করেছিল।

১৯৫৮ বিশ্বকাপে ইজরায়েলের সঙ্গে খেলতে অস্বীকার করে মিশর, সুদানের মতো দেশ। কারণটা স্রেফ রাজনৈতিকই। ২০০৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ছিল জার্মানি। প্রতিযোগিতা চলাকালীন নিও-নাৎসি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

কিন্তু শেষপর্যন্ত এই এত নজির ঢাকা পড়েছে ফুটবলের নান্দনিকতায়। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব কলম্বিয়ার হাত থেকে মেক্সিকোয় যায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত ‘ম্যাজিক’ দেখান দিয়েগো মারাদোনা। প্রায় একার কৃতিত্বেই দেশকে বিশ্বজয়ী করেন। সেই অসামান্য ক্রীড়ানৈপুণ্যের কাছে ফিকে হয়ে যায় কলম্বিয়ার আয়োজনের দায়িত্ব থেকে সরে আসার মতো ঘটনা। এভাবেই রাজনীতি ও যুদ্ধের রক্তচক্ষুকে হারিয়ে জিতে গিয়েছে ফুটবল। এবারের বিশ্বকাপে যেমন মেসির ‘অলৌকিক’ পারফরম্যান্স কিংবা রোনাল্ডোর প্রত্যাবর্তনই শিরোনামে ভেসে থেকেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘গাজোয়ারি’ যার কাছে গোহারা হেরেছে। বিশ্বকাপ যেই জিতুক, আখেরে এবারও জিতেই গিয়েছে ফুটবল!

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *