পদ আঁকড়ে থাকা বিভিন্ন দলে দস্তুর। বছরের পর বছর। কেউ কেউ আমৃত্যু। কমিটি বদল হয় না। হলেও সেই বদল সামান্যই। ফলে নেতৃত্বে বা কমিটিতে নতুন মুখ আসার সুযোগ কমে যায়। কাউকে একবার নেতৃত্ব থেকে বাদ দিলে তাঁর ফিরে আসা কঠিন হয়। ফিরলেও সেজন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। সমসাময়িককালের এই প্রবণতার পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন কিছুটা ব্যতিক্রমী বৈকি।
নতুন কমিটি গঠনে বিরাট ঝাঁকুনি আছে। কিন্তু পরিবর্তনে সবটাই নতুনত্ব নয়। বরং সর্বোচ্চ নেতৃত্বে কয়েকজনের পদ বজায় আছে। যে সিদ্ধান্তে স্পষ্ট, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ থাকছে তো বটেই। আরও বাড়ছে। সর্বভারতীয় সভাপতি থাকাকালীন একসময় জগৎপ্রকাশ নাড্ডা দাবি করেছিলেন, বিজেপি এখন অনেক সাবালক হয়েছে। সংঘের প্রভাবের বাইরে থেকে দল একাই চলতে পারে। বর্তমান সভাপতি নীতিন নবীনের টিম গঠনে কিন্তু উলটো অবস্থান দেখা যাচ্ছে।
এই অবস্থানের সবচেয়ে বড় উদাহরণ বিএল সন্তোষ। এত বড় রদবদলেও কর্ণাটকের এই নেতার পদ যায়নি। তিনি ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। যে পদটিকে বিজেপিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এমনকি সভাপতির চেয়েও বেশি মর্যাদা ও দায়িত্ব থাকে পদটিতে। প্রথাগতভাবে এই পদটিতে নিযুক্ত হন সংঘের কেউ। পদটিতে এবার চর্চায় ছিলেন সংঘের আরেক ঘনিষ্ঠ সুনীল বনসল।
বনসল সর্বভারতীয় অন্যতম সাধারণ সম্পাদকের পদে থেকে গিয়েছেন। কিন্তু সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক হিসাবে পদোন্নতি হয়নি। সন্তোষ থেকে গিয়েছেন সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক পদে। কিছুটা আড়ালে থেকে এই পদাধিকারী সংগঠন পরিচালনা করে থাকেন। বনসলের পাশাপাশি আরএসএস-এর আরেক কর্মকর্তা রাম মাধবকে আবার বিজেপির দায়িত্বে ফেরানো হয়েছে। তিনিও অন্যতম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তাঁকে ফেরানো ও সন্তোষ, বনসল ও রাম মাধবের ত্রিভুজ তাই সর্বভারতীয় বিজেপিকে পরিচালনায় সংঘের কর্তৃত্ব বজায় রাখার বার্তা।
আমূল বদল না হলেও এই রদবদলে আরেকটি বার্তা স্পষ্ট। প্রথমত, বয়সে প্রবীণ হয়ে গেলে, দ্বিতীয়ত দক্ষতা ও দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিতে না পারলে তাঁর বিদায় নিশ্চিত। বছরের পর বছর পদ ও কমিটি আঁকড়ে থাকার দিন বিজেপিতে আর নেই। নীতিন নবীন সর্বভারতীয় সভাপতি হবেন- এমন চর্চা বিজেপিতেও ছিল না। কিন্তু তাঁকে সভাপতি করে বিজেপি বার্তা দিয়েছিল, দলের নেতৃত্ব ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
দলের আইটি ও সমাজমাধ্যম সেলের আহ্বায়কের পদ থেকে অমিত মালব্যের অপসারণ ব্যর্থতার অন্যতম বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে মিথ্যা, অর্ধ সত্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারের অভিযোগ ছিল। তা নিয়ে পদ্ম শিবিরের কোনও অসন্তোষ আছে বলে কখনও শোনা যায়নি। কিন্তু যন্তরমন্তরের আন্দোলন চলাকালীন সমাজমাধ্যমে জেন জেড-এর প্রচারের মোকাবিলা করতে মালব্যর টিম চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছিল বলে বোঝা যায়।
কেন্দ্রীয় শিল্প বাণিজ্যমন্ত্রী পীয়ূষ গোয়েলকে দলের কোষাধ্যক্ষ করার পিছনেও মন্ত্রী হিসাবে তাঁর ব্যর্থতার কারণ আছে বলে মনে করা হচ্ছে। কোষাধ্যক্ষ হলে তাঁকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরানো হবে, ধরেই নেওয়া যায়। েকননা, বিজেপিতে এক ব্যক্তি, এক পদ কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। তার ওপর কোষাধ্যক্ষের পদটি সর্বক্ষণের। সেই পদে থেকে মন্ত্রিত্ব সামলানো অসম্ভব।
তরুণ প্রজন্মের মনোভাব বোঝার ওপর প্রচণ্ডভাবে জোর দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের ভাষণেও তার উল্লেখ করেছিলেন তিনি। সেই মতো দলের কার্যকলাপ ও কর্মসূচি গ্রহণের পক্ষপাতী প্রধানমন্ত্রী। যন্তরমন্তরে সরকারের পিছু হটায় জেন জেড-এর সঙ্গে দলের সম্পর্ক আলগা হয়েছে বলে বিজেপি মনে করছে। সেই ব্যর্থতার দায় বিজেপির যুব মোর্চার সর্বভারতীয় সভাপতি তেজস্বী যাদবের। তাঁকেও সরতে হল এই রদবদলে।

