- শুভময় সরকার
এ লেখার শুরুতেই কিছু দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল, দৃশ্যগুলো কাল্পনিক নয়, ভীষণভাবে বাস্তব এবং অনিবার্যভাবে অতীত। আমি যে নদীপাড়ের শহরে বড় হয়েছি, সে শহর সেদিনও বড় শহর ছিল, আজ তো মহানগর। তো শহরের যে প্রান্তে আমার বড় হয়ে ওঠা, স্কুলবেলা এবং প্রাক-যৌবনের কিছুটা সময় কেটেছিল তার লাগোয়া এক বিশাল রেল কলোনি। আয়তন এতটাই বিস্তৃত যে শহরের ভেতর যেন আলাদা এক অস্তিত্ব কারণ মূল শহরে থেকেও রেল কলোনি তার নিজস্ব নিয়মে চলত। যেহেতু লাগোয়া অংশে থাকা ফলত সেই অর্থে রেল কলোনির বাসিন্দা না হয়েও আমার যাপন-অস্তিত্বে মিশে ছিল রেল কলোনি, রেল অনুষঙ্গ। বন্ধুদের অধিকাংশই রেলের কোয়ার্টারে থাকত।
এই ভৌগোলিক বর্ণনাটুকু জরুরি ঘটনার প্রয়োজনেই। তো হঠাৎ খবর পাওয়া গেল রেলের সেন্ট্রাল হসপিটালের পেছনের অফিসার্স কলোনির এক বাংলো-বালিকার প্রেমে পড়েছে আমাদের এক বন্ধু, আমাদের ভাষায় ‘বালিকা-সন্ত্রাস’। প্রেমে পড়াকে আমরা নিজস্ব ভোকাবুলারিতে ‘বালিকা-সন্ত্রাস’ বলতাম। কোনও এক ডেপুটি-চিফের কন্যার প্রেমে বন্ধু হাবুডুবু। যে সময়ের কথা বলছি, সেটা প্রেমপত্রের যুগ, সব হার্ড কপি। আমাদের অ্যানালগ জীবনে সফটকপির সামান্যতম সংকেতও কোথাও ছিল না।
তো সুদীর্ঘ এক চিঠি লেখা হল আবেগের সব মশলা ঢেলে এবং প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা গেল স্কুল থেকে ফিরে বিকেলে পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা নাগাদ সেই মেয়েটি কোয়ার্টারের সামনের ছোট্ট লনেই সময় কাটায়। পরিকল্পনামাফিক আমাদের জনাকয়েকের সাইকেলটিম অপারেশনে নামল।
প্রথমে আমাদের প্রেমিক বন্ধু চলন্ত সাইকেল থেকে উড়ন্ত খাম পাঠিয়ে দিল লনে। প্রাথমিক অ্যাকশন শেষ এবং পরবর্তী সাইকেলগুলো সেই উড়ন্ত চিঠির আফটার-শকের রিপোর্ট নিয়ে জিএম বাংলোর পাশে পূর্বনির্ধারিত একটি জায়গায় হাজির হল। আমি সেই আফটার-শক টিমের সদস্য হিসেবে দেখতে পেয়েছিলাম– বাংলোর লনে ছুড়ে দেওয়া খাম মেয়েটি তুলে নিল, তারপর চিঠি হাতে দোলনায় বসল এবং তারপর আরও বিস্তর কাহিনী।
এ কাহিনীর পর আমার যাপনে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, মহানন্দা, গঙ্গা দিয়ে বিস্তর জল বয়ে গিয়েছে। সেই জলস্রোত আর জীবনস্রোতের মাঝেই আমরা হঠাৎই একদিন অ্যানালগ যাপন থেকে ডিজিটাল যাপনে ঢুকে গেলাম। প্রেমপত্র নামক সেইসব হাতে লেখা চিঠিপত্র গল্পগাথা হয়ে গেল। লুকোছাপা করা গোপন প্রেমের সেইসব কথিত এবং অকথিত কাহিনী ফেড হতে হতে কোনও এক অন্য জন্মের গল্প হয়ে গেল একসময়। কত সব কথা মনে পড়ে যাচ্ছে এ লেখার অনুষঙ্গে। সময় এক নিরবচ্ছিন্ন স্রোত, সেই কালস্রোতে বর্তমান কোনও একক, বিচ্ছিন্ন সময় পরিধি নয়। বর্তমান বলেও সেভাবে কিছু নেই। আসলে যা আছে তা অতীত এবং ভবিষ্যৎ আর এই অতীত-ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী বহমান যোগসূত্রই বর্তমান।
কিঞ্চিৎ জটিল করে দিলাম কি? তাহলে বরং কিছুটা সহজ করেই বলা যাক। আসলে বর্তমানকে দেখতে হয় অতীতের প্রেক্ষাপটে, বদলে যাওয়াটা বুঝতে সুবিধে হয়। ধীরে ধীরে বিবর্তিত হতে হতে হঠাৎ একদিন অনুভব করা যায় আমূল পালটে গিয়েছে সবকিছু।
সেই যে বলছিলাম, এ লেখার অনুষঙ্গে ফিরে আসছে কত স্মৃতি। আমার স্কুলবেলার সময় মা-কাকিমাদের ম্যাটিনি শো-তে ম্যাটিনি আইডলের সিনেমা দেখার সেই রোমান্টিক আবহ আস্তে আস্তে অনেকটাই পালটে গেল আমাদের ‘হঠাৎ যেদিন যুবক’ হবার দিনগুলোতে। সেই পরিবর্তিত সময়স্রোতে উত্তম-সুচিত্রা জুটির সাদাকালো দিন পেরিয়ে মিঠুন তখন এন্ট্রি নিচ্ছেন আধোআলো ছায়ার ‘কিছু ভালবাসা’র দিনে, আমরাও বড় হচ্ছি, উত্তমকুমারের ঘুরে তাকানোর রোমান্টিক যৌনতা এসে মিশে যাচ্ছে মিঠুনের পেশিবহুল শরীরে।
চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়ার পাশাপাশি আমাদের রোমান্টিকতাকে নতুন সুরে বাঁধছেন এক কবি, যিনি লিখছেন শুভঙ্কর আর নন্দিনীর কাহিনী। আমাদের কলেজ, ইউনিভার্সিটি চত্বরের আড্ডায় বান্ধবী-প্রেমিকা হঠাৎ কার্সিয়াং টাওয়ার দেখতে দেখতে প্রেমিকের দু’আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটের দিকে তাকিয়ে নন্দিনী হয়ে হঠাৎই কপট রাগ দেখিয়ে বলে উঠছে – ‘তুমি আজকাল বড় সিগারেট খাচ্ছ শুভঙ্কর’, আর এসব শুনতে শুনতেই শুভঙ্কর নামক এক তরুণ স্বপ্ন দেখছে ‘দশ দিগন্তের অন্ধকার’ হবার।
তো তেমনই এক তুমুল হইহল্লার দিন পেরিয়ে ডিজিটাল প্রেমের যুগে শোনা গেল অপরিচিত এক নাম ধরণীতে – ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’। বেশ মনে পড়ে আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে এক ছাত্র সন্ধেবেলা বাড়িফেরার পথে দেখা হওয়াতে আমায় বলেছিল ‘হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে স্যর’, ছাত্রজীবনের গন্ধ তখনও যায়নি আমার, অজ্ঞতাকে স্মার্টনেসে ঢেকে মৃদু হেসে কিছু একটা বলেছিলাম প্রত্যুত্তরে।
সে’সময় আশপাশে গুগল নেই, তো নেহাতই কৌতূহলবশত খোঁজখবর করে জেনে নিয়েছিলাম সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক সেই খ্রিস্টান পাদরির ইতিহাস, যিনি একজন চিকিৎসকও ছিলেন। বিস্তর নারীসঙ্গের অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই আমার প্রথম ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ শব্দটির সঙ্গে পরিচয়। তারপর বছরে তিরিশবার নানাবিধ ‘ডে’ পালনের বহুজাতিক প্রচারমূলক আতিশয্যে প্রেমের দিবস আজ ডানা মেলেছে অনেক খোলামেলা আকাশে, যেখানে বাধা কম, বড়দের চোখরাঙানো কম, হাতে লেখা চিঠিপত্রের ঝামেলা নেই, রঙিন খামের খরচ নেই। কিপ্যাডে আঙুলের সামান্য নড়াচড়ায় পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে থাকা প্রেমিকার সঙ্গে যোগাযোগ, কথা, ভিডিও কথোপকথন।
রক্তমাংসের প্রেমের সমান্তরালে এক ভার্চুয়াল প্রেমের পথও আজ খোলা। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সময়ের সঙ্গে কি প্রেমের মাধুর্য ক্রমহ্রাসমান? এ প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই তো আসে মনে, অন্তত যাদের তুমুল রোমান্টিকতার সময়টা কেটেছে দু’হাজার সালের আগে, তবে এই ক্রমহাসমানতার তত্ত্বে আমার বিশ্বাস নেই। প্রেম আছে, ভীষণভাবেই আছে ; শুধু সময়, আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পালটেছে মাত্র…!
আমাদের ভ্যালেন্টাইন্স ডে ছিল না, ছিল সরস্বতীপুজোর জন্য বছরভর অপেক্ষা। এবারও তো দেখলাম পুজোর দিন এই প্রজন্মের রঙিন প্রজাপতির মতো প্রেম, এ মাসেই আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে, প্রেমের ‘ডাবল ধামাকা’। অসুবিধে কোথায়…! মানুষ তো আসলে প্রেমেই বাঁচে, যে বয়েসেই হোক না কেন…! বয়সের সঙ্গে গভীরতার তারতম্য ঘটে বটে, কিন্তু প্রেম রয়ে যায়, রয়েও যাবে যতদিন অবধি বুকের বাঁ-দিকে একটা হৃদয় থাকবে। বুকের গভীর থেকে অভিমান ঠেলে উঠে গলার কাছে দলা পাকিয়ে যাওয়ার আবার সেকাল-একাল কী…!
