পশ্চিম এশিয়া ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে উত্তাপ ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়ায় সারা বিশ্ব খানিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল। কিন্তু সেই উত্তাপ আবার বিধ্বংসী হয়ে ওঠার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের ঘোষণা করার পর মার্কিনি সেনা ইরানের অনেক সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। জবাবে ইরানও কুয়েত ও বাহরিনে মার্কিন সেনাঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এই সামরিক সংঘাত সমগ্র পশ্চিম এশিয়াকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সংঘাতের আঁচ যে ভারতের ওপরেও পড়বে, তা নিয়ে সংশয় নেই। ভারতের অপরিশোধিত খনিজ তেলের প্রায় পঁচাশি শতাংশ আসে বিদেশ থেকে। তার সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে সংঘাত তীব্র হলে তার প্রভাব হরমুজ প্রণালীতে পড়বে।
মাঝে আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে সমঝোতার রাস্তা খুলেছিল বলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী ফের অবরুদ্ধ হলে তেলের আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যাহত হবে। ফলে ভারতীয় বাজারে জ্বালানির দাম এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি এক ধাক্কায় অনেকখানি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে ভারতীয় তেল সংস্থাগুলি পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে।
জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সরকারের একমাত্র উপায়, শুল্কের হার কমানো। সরকার শুল্কের হার কমালে রাজস্বে টান পড়বে। আবার জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে পরিবহণ খরচ বাড়বে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, এমনকি শাকসবজির দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
এই মুহূর্তে ভারতকে দুটি কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে। একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতি সামাল দিতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান- উভয় দেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যথেষ্ট দৃঢ়। এই পরিস্থিতিতে কোনও একটি বিশেষ পক্ষ অবলম্বন করা ভারতের পক্ষে অসম্ভব।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু বলে নিজেকে জাহির করুন না কেন, ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন খাতে বইছে, সেদিকে তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইরানের দিকে সামান্য ঝুঁকলে তিনি ভারতকে রেয়াত করবেন না। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সে সম্পর্ক বজায় রাখার দায় ভারতের কিছু কম নয়।
ভারত যেভাবে ইদানীং আমেরিকার দিকে খানিক ঝুঁকেছে, তা ইরানের মনঃপুত হওয়ার কথা নয়। যদিও এব্যাপারে ইরান ভারতের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত পদক্ষেপ করার হুমকি দেয়নি। কিন্তু যদি আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হয়, তাহলে ভারতের পক্ষে দুই দেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দুষ্কর হয়ে পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে ভারতের বিদেশমন্ত্রক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উভয়পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। এই উত্তেজনার মাঝে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর কাতার, বাহরিন, কুয়েত ও ওমান সফরে রয়েছেন। যুদ্ধবিরতিকালে তিনি সফর শুরু করেছেন। কিন্তু তাঁর সফরের মাঝে ফের পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বিশ্বের কাছে তাঁকে তুলে ধরতে হবে, ভারতের মূল লক্ষ্য, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানো এবং হরমুজ প্রণালীতে অবাধ বাণিজ্য নিশ্চিত করা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ভারতের কাঁধে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে বহু ভারতীয় কর্মরত রয়েছেন। প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ভারতের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। সবদিক পর্যালোচনা করে বলা যায়, ভারতকে এখন অত্যন্ত সতর্ক পদচারণা করতে হবে, নাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থতি অশান্ত হয়ে উঠতে পারে।

