দেবীপক্ষেও উপেক্ষিত নয় অসুর! ঝাড়খণ্ড ছুঁয়ে থাকা পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ গ্রাম বাঘমুণ্ডির চড়িদায় দেদার বিক্রি হচ্ছে অসুরের মুখোশ। শুধুই কি মহিষাসুর? অসুরদের কত কি রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মুখোশে। রক্তাসুর ( রক্তবীজ), ভস্মাসুর, রাবণাসুর, তারকাসুর, বৃষাসুর, ঘোড়াসুর। এতদিন যা ছিল ছৌ পালায়। এখন সেই সব নানান অসুরদের রূপ পুজোর আবহে কার্যত ঘর সাজানোর মুখোশে নজর কেড়েছে! হ্যাঁ, বুরি নজর থেকে বাঁচতে মুখোশ গ্রামে এই অসুরদের মুখোশই যেন ট্রেন্ডিং হয়ে গিয়েছে। আর তাকে ঘিরে পুজোর মুখে লক্ষ্মীলাভ হস্তশিল্পীদের।
ওই অসুরের কালো মুখ যেন ‘বুরি নজর বালি তেরা মুহ কালা’-র সঙ্গে সমার্থক হয়ে গিয়েছে। তাইতো এত বিক্রি। ঘর সাজানোর ওই মুখোশের দাম চড়েছে ১৫০ থেকে ৩২০০। সাধারণত ছৌ নাচের পালায় হাজার তিনেক থেকে মুখোশের বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু শারদ পর্যটনে ওই ঘর সাজানোর মুখোশই ৩ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। প্রায় দেড় বছর আগে এই মুখোশ গ্রামে খারাপ নজর এড়াতে নজরকাঠি মুখোশ ব্যাপক নজর কেড়েছিলো। আর এবার দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে সেই কুনজর থেকে বাঁচতে অসুরের মুখোশ নজরকাঠিকে পাল্লা দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
চড়িদার হস্তশিল্পী আকাশ সূত্রধর বলেন, “ওই নজরকাঠিকে পাল্লা না দিলে ঘর সাজানোর অসুরের মুখোশের দাম কি ৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়? আমাদের মুখোশ গ্রামে কখন যে কি ট্রেন্ডিং! আর সেই মোতাবেক মুখোশ না বানালে বাজারে টিকে থাকা যায় না। তাই এখন এই মুখোশ গ্রামে এমন কোন দোকান নেই যে নানান অসুরের মুখোশ পাবেন না।”

তবে খারাপ নজর থেকে বাঁচতে অসুরের মুখোশকে কার্যত ঘরে নিয়ে আসা এই বিষয়টিকে ‘অপমান’ বলেই মনে করেন ‘হুদুড় দুর্গা’র আরাধনা করা ‘শিকার দিশম খেড়োয়াল বীর লাকচার গাঁওতা’-র সম্পাদক তথা পুরুলিয়ার কাশীপুরের ভালাগোড়ার বাসিন্দা অজিতপ্রসাদ হেমব্রম। তাঁর কথায়, “পুরাণে দেবতা এবং অসুর একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। এক পক্ষ জয়ী হয়। আরেক পক্ষ হেরে যায়। যারা শাসক থাকেন তারাই তো সব সময় প্রচারের আলোয় থাকেন। আর সেই প্রচারের আলোয় থেকে অসুরদের এভাবে দেখা হচ্ছে।”
ইতিহাস বলছে, সাবেক মানভূমে অসুরদের আধিপত্য ছিল। তাই পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক সুভাষ রায় বলেন, “এখানে জৈনরা আসার ফলে অসুরদের সঙ্গে বিবাদ বাঁধে। এই অঞ্চল জৈনরা দখল করলে অসুররা দূরে চলে যান। কিন্তু সাবেক মানভূমে অন্যতম আদি জনগোষ্ঠী অসুর। তাই এখানকার হস্তশিল্প, এমনকি লোক নৃত্য ছৌ নাচে অসুর কেন্দ্রিক প্রচুর পালা পরিবেশিত হয়।”
মুখোশ গ্রামে ঘর সাজানোর রক্তাসুর মুখোশ বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকায়। রাবণাসুরের দাম ১৪০০। নৃত্য ভঙ্গিমায় অসুরের দাম ১ হাজার। বাবুই ঘাস, পালক, ভেড়ার লোম বা খেজুর ছাল দিয়ে প্রাকৃতিক উপাদানে মহিষাসুরের দাম ১৭০০ টাকা। আর ঘর সাজানোর তারকাসুর যা প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি করেছেন এই হস্তশিল্পীরা। তার দাম উঠেছে ৩২০০ টাকা। তাই চড়িদার আরেক হস্তশিল্পী বিজয় সূত্রধর বলেন, “মা আসছেন ঠিকই, কিন্তু তাই বলে ব্রাত্য নন অসুর।”
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
