চেনা গণ্ডির বাইরে অচেনা পাঠ

চেনা গণ্ডির বাইরে অচেনা পাঠ

ব্লগ/BLOG
Spread the love


(যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় সৃজন ও মনন মিলেমিশে অনন্য এক দৃষ্টান্ত গড়েছে)

সাহানুর হক

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি কেবল তথ্য মুখস্থ করা, নাকি মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, কল্পনা করার ক্ষমতা এবং নিজস্ব চিন্তার জন্ম দেওয়া? খুব সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২৬ সালের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এই মৌলিক প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই প্রশ্নপত্রের প্রতিটি বিষয়ে যেন বর্তমান সময়ের যান্ত্রিক ও ক্লান্তিকর শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে। দীর্ঘকাল ধরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্যসমৃদ্ধ উত্তরের পেছনে ছুটতে ছুটতে শিক্ষার্থীরা যে প্রাণহীন হয়ে পড়ছিল, এই প্রশ্নপত্রটি সেই অসারতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এখানে পুঁথিগত উত্তরের চেয়েও শিক্ষার্থীর নিজস্ব ভাবনা ও স্বাধীন সত্তাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইদানীংকালের প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা প্রায়শই সিলেবাস, নোট ও সাজেশননির্ভর প্রস্তুতির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখে। ঠিক সেই গণ্ডিকে চ্যালেঞ্জ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নে উঠে এসেছে ছোটবেলার ইচ্ছে, প্রিয় সাহিত্যিকের উদ্দেশ্যে লেখা খোলা চিঠি, উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের তুলনা, ঈশ্বরের কাছে জানতে চাওয়া কিছু প্রশ্ন, বনভূমি উজাড়ের ফলে পাখিদের কথোপকথন এবং পথের পাঁচালীর দুর্গার সঙ্গে কাল্পনিক ট্রেন সফরের মতো বিষয়। এমন অদ্ভুত অথচ গভীর প্রশ্নগুলি কোনও পরীক্ষার্থীর কেবল বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা নেয় না, বরং তার অনুভূতির জগৎকে নাড়িয়ে দেয়। প্রতিটি প্রশ্ন যেন একজন শিক্ষার্থীর কল্পনাশক্তি, সাহিত্যবোধ ও বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে একসঙ্গে যাচাই করার এক অনন্য প্রয়াস।

এই প্রশ্নগুলির উত্তর কোনও গাইড বই থেকে সরাসরি তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে শিক্ষার্থীর জীবনানুভব, ভাষাবোধ ও চিন্তার স্বাধীনতায়। সৃজনশীলতায় ভরপুর এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য শুধু মুখস্থবিদ্যা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গভীর জীবনবোধ ও কল্পনাশক্তি। ডিজিটাল যুগে তথ্য এখন হাতের মুঠোয়, একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে সেকেন্ডের মধ্যে হাজারো তথ্য পাওয়া সম্ভব। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ আর জ্ঞান অর্জন কখনোই এক নয়। তথ্যের পাহাড় গড়ে তোলা সহজ, কিন্তু সেই তথ্যকে নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে যাচাই করে নিজস্ব মতামত তৈরি করা বড়ই কঠিন। তথ্য মানুষকে জানতে সাহায্য করে, কিন্তু সৃজনশীলতা মানুষকে ভাবতে শেখায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রশ্নপত্র সেই সৃজনশীলতাকেই প্রাধান্য দিয়েছে।

এই প্রশ্নপত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন হল, এখানে শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে দেখা হয়েছে, কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় পারদর্শী পরীক্ষার্থী হিসেবে নয়। উত্তরের চেয়েও এখানে অনুভব, যুক্তি ও কল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা যখন প্রাণহীন যান্ত্রিকতা পেরিয়ে প্রাণের স্পন্দন খোঁজে, তখনই তা সার্থক হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়টির এই উদ্যোগ আসলে গভীর মানবিক শিক্ষারই আধুনিক রূপ, যা ব্যাকরণ শেখানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে নিজের ভাষায় নিজের পৃথিবী নির্মাণ করতে শেখায়। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের এমন সাহসী পদক্ষেপ প্রমাণ করে, বিদ্যা অর্জন কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা প্রতিনিয়ত জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার এক নিরন্তর প্রক্রিয়া।

শিক্ষার মূল লক্ষ্য কেবল চাকরি পাওয়া নয়, বরং মানুষের ভেতরের গভীর ঔৎসুক্যের বিকাশ ঘটানো, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা। পুঁথিগত বিদ্যার সীমানা অতিক্রম করে এই ধরনের উদ্যোগ যদি উত্তর থেকে দক্ষিণ, ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর প্রতিটি শিক্ষা ব্যবস্থায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতের প্রজন্ম কেবল তথ্যসমৃদ্ধ নয়, বরং চিন্তাশীল ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। যে শিক্ষা মুখস্থ উত্তর নয়, নতুন প্রশ্ন করতে শেখায়, সেই শিক্ষাই ভবিষ্যতের সমাজ গড়তে পারে। আগামীদিনে এমন প্রশ্নপত্র হয়তো নিয়মিত চর্চার অংশ হয়ে উঠবে, যেখানে সিলেবাসের চেয়ে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতার দাম বেশি দেওয়া হবে। শিক্ষার এই নতুন ভাষ্যই বাংলার শিক্ষা ও সমাজ চিন্তার আশাব্যঞ্জক দিগন্ত হয়ে উঠুক, এই স্বপ্ন দেখতে দোষ কী!

(লেখক গ্রন্থাগারিক দিনহাটার নয়ারহাটের বাসিন্দা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *