প্রকৃতি কীভাবে পাহাড়, পর্বত, নদীনালা, খালবিল তৈরি করবে, সেটা কখনও সরকারি নথি ঠিক করে দিতে পারে না। প্রকৃতি কীভাবে তার সম্পদ রক্ষা করবে, তাও কখনও সরকার এবং আদালত নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ঠিক হতে পারে না। প্রকৃতি আপন খেয়ালে চলে। নিজের লোভ চরিতার্থ করতে মানুষ তাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। তার ফল হয় নির্মম।
আরাবল্লি পর্বতমালা নিয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত সেই কারণেই নিজের পায়ে কুড়ুল মারার সমতুল। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রক প্রস্তাবিত যে সংজ্ঞায় সুপ্রিম কোর্ট সিলমোহর দিয়েছে, তাতে সমতল থেকে ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু ভূখণ্ডকে শুধু পাহাড় হিসাবে গণ্য করার বিধান আছে। পরিবেশবিদদের মতে, মানদণ্ড কার্যকর হলে রাজস্থানে ৫৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ আরাবল্লি রেঞ্জের বিশাল অংশ সুরক্ষা কবচ হারাবে। কারণ, আরাবল্লির মাত্র ৮.৭ শতাংশ এলাকা ১০০ মিটারের বেশি উঁচু। ফলে বাকি অংশ খনি মাফিয়াদের সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে।
ইতিমধ্যে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বহু পরিবেশবিদ ও সাধারণ মানুষ আরাবল্লিকে বাঁচাতে সরব হয়েছেন। তাঁদের মতে, আরাবল্লি শুধু পর্বতমালা নয়, রাজস্থানের জীবনরেখা। এজন্য সমাজমাধ্যমের পাশাপাশি মানুষ পথে নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কেননা, পাহাড়ের এই নতুন সংজ্ঞায় আরাবল্লিজুড়ে ইতিমধ্যে খনি হাঙরদের দাপাদাপি শুরু হয়ে গিয়েছে। আরাবল্লির ভূগর্ভে সঞ্চিত বিপুল খনিজ ভাণ্ডারের নাগাল পেতে মরিয়া খনি হাঙররা।
দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে নিজেদের ধনসম্পত্তি বাড়াতে আরাবল্লির মৃত্যু পরোয়ানায় সই করতে দ্বিধা নেই তাঁদের। এতে রাজস্থান, গুজরাট, হরিয়ানা, দিল্লি এনসিআর এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে আরাবল্লির রক্ষাকবচ খনি হাঙরদের লোভের কারণে এখন ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে। উন্নয়নের নামে আরাবল্লিতে খনন ও পরিকাঠামো নির্মাণে বুলডোজার চালানো হলে স্থানীয়রা তো বটেই, দিল্লি-এনসিআরের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে।
পিপল ফর আরাবল্লি নামে একটি সংগঠনের নেত্রী নীলম আলুওয়ালিয়া মনে করেন, আরাবল্লিকে উচ্চতার মাপকাঠিতে না দেখে তার বাস্তুতন্ত্রগত, ভূতত্ত্বগত এবং পরিবেশগত ভূমিকা বিবেচনা করা দরকার। থর মরুভূমির উত্তর ভারতের দিকে এগোনো থেকে আটকে আরাবল্লি দিল্লির দূষণ খানিকটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করছে ও ভূগর্ভস্থ জল রক্ষায় কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছে।
শুধুমাত্র আইনের সংজ্ঞার কারণে সেসব উপেক্ষা করা হলে বিপদ বাড়বে। কিন্তু কেন্দ্র ও রাজস্থান সরকার এসবে কর্ণপাত করছে না। কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সাফাই, আরাবল্লির মাত্র ০.১৯ শতাংশ এলাকায় বৈধ খনন হয় এবং পাহাড়ের নতুন সংজ্ঞায় সুরক্ষায় কোনও বিঘ্ন ঘটবে না।
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধি চলতি মাসের গোড়ায় একটি সংবাদপত্রে উত্তর সম্পাদকীয় নিবন্ধে অভিযোগ করেছিলেন, কেন্দ্রীয় সরকার আরাবল্লির মৃত্যু পরোয়ানায় সই করেছে। ফলে দেশের পরিবেশের সুরক্ষা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আরাবল্লি ভারতের প্রাচীনতম অথচ ভঙ্গুর পর্বত। উত্তর ও পশ্চিম ভারতের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এই পর্বতশ্রেণির ভূমিকা অনেকখানি।
তাই উন্নয়নের অছিলায় এই গুরুত্বপূর্ণ পর্বতমালায় খনন ও নির্মাণ শুধু হঠকারী নয়, আত্মঘাতীও। আরাবল্লির মতো গ্রেট নিকোবর প্রকল্প নিয়েও পরিবেশবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন। ওই প্রকল্প কার্যকর হলে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবেই। সেইসঙ্গে ধ্বংসের মুখে পড়বে সেখানকার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। দিল্লি সহ গোটা উত্তর ভারতে দূষণ বর্তমানে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। দেশের রাজধানীতে ধোঁয়াশা এতটাই ক্ষতিকারক যে, প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়াই দুষ্কর হয়ে গিয়েছে।
অথচ দেশের সমস্ত খনিজ সম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতির হাতে তুলে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। আরাবল্লি নিয়েও মানুষের প্রতিবাদ তাদের কানে পৌঁছোবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।
The put up আশঙ্কার পাহাড় appeared first on Uttarbanga Sambad.
