সুমন্ত বাগচী
আমাদের চারপাশের জগৎটা বর্তমানে যেন নেতিবাচক খবরের একটি নিরবচ্ছিন্ন স্রোতে পরিণত হয়েছে। মা অভাবের তাড়নায় সন্তানকে ত্যাগ করছেন, নাবালক পুত্রের হাতে বাবা খুন হচ্ছেন, আবার রাজনৈতিক দলবদলের হিড়িক বা নৃশংস পরকীয়ার খবর তো নিত্যদিনের ঘটনা। এইসব হাহাকারের মাঝখানেও কখনো-কখনো কোনও খবর বা ঘটনা যেন রাতের ঘন কালো মেঘে ঢাকা আকাশে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো ক্ষণকালের জন্য হলেও সবকিছু আলোকিত করে তোলে। এই ছোটখাটো ঘটনাগুলো আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীটা কেবল নিষ্ঠুরতা দিয়েই তৈরি নয়। অন্ধকার যতই গভীর হোক, মানবিকতার স্ফুলিঙ্গ এখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি।
এর একটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায় নরওয়ের রাজপরিবারের দিকে তাকালে। যুবরানি মেট ম্যারিট দীর্ঘদিন ফুসফুসের জটিল রোগে আক্রান্ত। রাজপরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ মানুষের মতোই স্বাস্থ্য পরিষেবার দীর্ঘ অপেক্ষায় বা ওয়েটিং লিস্টে নিজের নাম নথিভুক্ত করেছেন। তিনি সামান্যতম কোনও বাড়তি সুবিধা পান না, এমনকি তার প্রত্যাশাও করেন না। এটি সামাজিক সাম্যের এমন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা আমাদের চোখ ঝলসে দেয়। নরওয়ে কোনও সমাজতান্ত্রিক দেশ নয়, মার্কসবাদের সঙ্গে এর সম্পর্ক খুবই ক্ষীণ। তবুও প্রকৃত সাম্যচর্চাকে তাঁরা জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। অন্যদিকে, কিম জং উনের উত্তর কোরিয়ার মতো তথাকথিত মার্কসবাদী রাষ্ট্রগুলোর শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে মধ্যযুগীয় অত্যাচারী সম্রাটদের ব্যবস্থার কোনও পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
অনেকেই হয়তো ভাববেন এমন সাম্যের উদাহরণ কেবল ইউরোপেই সম্ভব, আমাদের জন্য নয়। কিন্তু এই ধারণা ভুল। অতি সম্প্রতি একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনাটি বেশ আলোড়ন ফেলেছিল। ছাত্রের অভিযোগ ছিল শিক্ষক তাকে বকাঝকা করেছেন। এর পেছনে ছাত্রটির বিত্তশালী পরিবারের প্ররোচনা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু বিচারক সেই শিক্ষককেই সমর্থন জানিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, শিক্ষক শাসন করেন বলেই তাঁর মতো একজন বিচারক তৈরি হতে পেরেছেন। তিনি ছাত্রের পরিবারকে সর্বসমক্ষে তীব্র ভর্ৎসনা করেন। সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ওই শিক্ষকের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী এবং সহকর্মীরা তাঁর পাশে দাঁড়ান। অর্থাৎ অভিভাবক শিক্ষককে শাস্তি দিতে এসে উলটে তাঁকে সামাজিকভাবে পুরস্কৃতই করে ফেললেন।
সমাজের এই সততা কেবল বড় জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। সপ্তাহখানেক আগে ফাটাপুকুর–রাজগঞ্জ অঞ্চলের একজন শিক্ষক ভুল করে একটি টোটোয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ প্রায় লাখখানেক টাকা ফেলে চলে গিয়েছিলেন। অবিশ্বাস্যভাবে সেই টোটোচালক টাকা সহ ব্যাগটি ফেরত দিয়ে সততার পরিচয় দিয়েছেন। এমন উদাহরণ শুধু যে সেই চালকের, তা নয়। সম্প্রতি দেখেছি, কলকাতার এক পথচারী কোনও এক বৃদ্ধের হারিয়ে যাওয়া সঞ্চয়ের থলি উদ্ধার করে থানায় পৌঁছে দিয়েছেন, অথবা এক সবজি বিক্রেতা তাঁর সারাদিনের আয়ের একটি অংশ অনাথ আশ্রমের জন্য দান করে চলেছেন। আমরা তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্ররা সামান্য আর্থিক সুবিধা ব্যাহত হওয়ার ভয়ে কত আপস করি, কত অন্যায় নীরবে সহ্য করি। অথচ একজন খেটেখাওয়া মানুষ বা সাধারণ সবজি বিক্রেতা সমাজে যে দৃষ্টান্ত রাখলেন, তাতে তাঁরা প্রকৃত শিক্ষকের ভূমিকাই পালন করলেন।
সুদূর নরওয়ে থেকে আমাদের দেশ হয়ে একেবারে ঘরের কাছে মানবতার বিদ্যুৎ একইভাবে ঝলসে উঠছে। মানুষের প্রতি মানুষের এই বিশ্বাসই সমাজকে বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের মনে পড়ে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের সেই বিখ্যাত কবিতার কথা, যেখানে তিনি লিখেছিলেন—প্রাণ আছে, এখনো প্রাণ আছে। এই প্রাণের স্পন্দনই আমাদের আগামীর পৃথিবী গড়ার প্রধান শক্তি। নেতিবাচকতার অতল গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হল এই ছোট ছোট মানবিক ঘটনাগুলোকে সম্বল করে এগিয়ে যাওয়া। কারণ দিনশেষে মানুষই মানুষের ভরসা।
(লেখক শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

