লক্ষ্মী এল
শ্রেয়সী গুহ
চোখ মেলে মনে করতে পারল না মেঘলা এটা কি সকাল, না বিকাল। বাতাসে ভেজা ভেজা গন্ধ। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা তিস্তার স্পার। শ্রাবণের গোধূলিবেলা গেরুয়া হয় না, হয় নীলচে ধূসর, মানুষের বিষণ্ণ মনের মতো। তিস্তায় দাঁড় করানো সারি সারি নৌকার পাল দেখা যাচ্ছে। মাঠে তো খুব জল, তাই পাথর দিয়ে একটি রাস্তা করা। পাথরে উঠে মেঘলার চিৎকার, ‘পড়ে গেলাম! মরে গেলাম! বাঁচাও!’ একজন বৃদ্ধ মাঝি এগিয়ে এসে মেঘলার হাত ধরলেন। বললেন, ‘ভয় নেই মা, এসো।’ পাথর থেকে নেমে তবুও খানিক জমা জলে হাঁটতে হল।
-‘জোঁক নেই তো, কাকা?’
-‘না গো, নেই। নৌকা চড়বে?’
-‘হ্যাঁ, চড়ব!’
নদীর ধারে পৌঁছে মাঝি একটি নৌকা দেখিয়ে বললেন, ‘এই নৌকায় ওঠো, আমার ভাগ্নের নৌকা।’ অল্পবয়সি ছেলেটি মৃদু হেসে বলল, ‘আসো দিদিভাই।’ নৌকায় বসে হঠাৎ মেঘলা দেখল, তিস্তার হিংস্র কালো জল শোঁ শোঁ শব্দ করে ছুটে চলেছে; সে ভাবল, যদি মাঝপথে নদীতে ঝাঁপ দেই, কেমন হবে? বেশ হবে না? মেঘলার সংবিৎ ফিরল তরুণ মাঝির স্বরে, ‘আজ তুমিই প্রথম কাস্টমার দিদি! ওই পঞ্চাশটা টাকা দিয়ে তাও খানিক বাজার করতে পারব।’ এই বলে সে মেঘলার পাড়িয়ে যাওয়া নৌকার পাটাতনে মাথা ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘লক্ষ্মী এল।’
চোখের জল আর ধরে রাখতে পারল না মেঘলা। নদীর জল, শ্রাবণের ঘনঘোর মেঘ, আর্দ্র বাতাস সমস্বরে বলে উঠল, ‘লক্ষ্মী এল।’
মরু সাহারার পথে
সুমিত রায়
সাহারার বালি তখন আগুনের মতো গরম। পা রাখলেই মনে হয় জুতোর তলা গলে যাবে। অনিরুদ্ধ তিনদিন হাঁটছে, জিভটা যেন কাঠ। জল নেই। একদম শেষ।
দূরে একটা চালা দেখল। পুরোনো, ভাঙাচোরা। কাছে গিয়ে দেখে একটা মরচে পরা হ্যান্ডপাম্প বসানো, পাশে মাটিতে গাঁথা একটা বোতল- তাতে সামান্য জল। আর একটা ছেঁড়া, ময়লা কাগজ, তাতে হাতের লেখা, একটু অস্পষ্ট – ‘এই জল খাবেন না, দয়া করে। পাম্পে ঢেলে দিয়ে চালান। জল উঠবে।’
অনিরুদ্ধ প্রথমে হাসল। পাগলামি নাকি? এই জলটাই যা আছে, খেয়ে নিলে বাঁচা যায়। ফেলে দিলে? যদি পাম্প না চলে? তখন কী হবে কে জানে।
তবু কেন যেন হাতটা কাঁপল, আর বোতলটা খুলে জলটা ঢেলে দিল পাম্পে। মনে মনে ভাবল, মরতেই যদি হয় একটা চান্স নিয়েই মরি।
হাতল টানতে থাকল। এক মিনিট। কিছু হল না। দুই মিনিট। শরীরে আর জোর নেই। তিন মিনিটের মাথায় হাতটা যখন থেমে যাচ্ছে প্রায়, তখনই ফচ করে একটা শব্দ, আর তারপর হুড়মুড় করে ঠান্ডা জল।
অনিরুদ্ধ বসে পড়ল মাটিতে। কাঁদল না ঠিক, কিন্তু চোখ ভিজল। মুখে হাসিও এল আপনা থেকে।
জল খেয়ে বোতলটা আবার ভরল। রাখল আগের জায়গায়। কাগজটা হাতে তুলে, পেন খুঁজল না- আঙুল ভিজিয়ে বালির উপর লিখল প্রথমে, তারপর মনে হল না, কাগজে লেখাই ভালো, পরের কেউ পড়তে পারবে। পকেট থেকে একটা পুরোনো পেন্সিলের টুকরো পেল। তাতেই লিখে দিল নীচে- এটা সত্যি কাজ করে। আমিও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি, তারপর করেছিলাম, বেঁচে গেলাম। আপনিও করুন, নিরাশ হবেন না।
কাগজটা রেখে হাঁটা দিল। পিছনে তাকাল একবার। কে জানে পরে কে আসবে, কবে আসবে। কিন্তু ওই কাগজটা এখন থেকে ওর কাজ করবে, ওকে ছাড়াও।
The submit অণুগল্প appeared first on Uttarbanga Sambad.
