দাম্পত্য
ঋষিরাজ মোহন্ত
একঘেয়েমি অভ্যাস নিয়ে বাঁচে অমৃতা। বাচ্চা, রান্নাঘর, ছাপোষা পৃথিবী। রোজকার জীবন নিয়ে তিক্ত সোমনাথও। ফাইল, অফিসের চার দেওয়াল, ক্লান্তি। বাড়ি ফিরে সেই এক দৃশ্য, বাচ্চার পেছনে অমৃতার খাবার নিয়ে দৌড়। অমৃতা এখন রাতে কাছে এলে তাঁর শরীর থেকে যেন রান্নাঘরের ঝাঁঝালো গন্ধ আসে। বমি পায় সোমনাথের। তাঁকে সময় দেওয়ার বদলে আগেই ঘুমিয়ে পড়ে অমৃতা। সোমনাথের মুখে এসব এতক্ষণ শুনছিলেন আইনজীবী রৌনক চক্রবর্তী।
সোমনাথ অফিস মিটিং বলে কিছুদিন পূর্বার সঙ্গে কাটাবে রৌনকের পাশের ফ্ল্যাটে। পূর্বা আর সোমনাথ সহকর্মী। সে-ও সংসার জীবন থেকে মুক্তি পেতে সোমনাথের কাছে আসে ভালো সময় কাটাতে। আর মাত্র কয়েকটা মাস। তারপর রৌনক অমৃতাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবে। চিরকালের মতো মুক্তি।
রৌনক তাঁর স্ত্রী ঊর্মি ও সন্তানদের নিয়ে সুখে সংসার করছেন। রোজ রাতে তাঁদের ভালোবাসার বার্তালাপ, বাচ্চাদের হইহল্লা শুনতে পায় সোমনাথ। তবে এখনও তাঁদের সঙ্গে আলাপ হয়নি। আজ সোমনাথ আর রৌনক পার্টিতে গিয়েছিল। রৌনক একটু বেশি ড্রিংক করে ফেলেছে। তাই ঘর পর্যন্ত ছাড়তে গেল সোমনাথ।
রৌনকের ফ্ল্যাটে ঢুকল। চারদিকে গুমোট অন্ধকার। রৌনকের হুঁশ নেই। এদিকে, তাঁর স্ত্রীকেও দেখা যাচ্ছে না। মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালল। লাইট জ্বালাতে গিয়ে একটা সুইচ টিপতেই গোটা ঘরে শুরু হল শব্দ। সেখানে রৌনক ও ঊর্মির কথোপকথন বাজছে। এরপর বাচ্চাদের হইহল্লা। মনে হল, এসব রেকর্ড করা। দেওয়ালে চোখ গেল সোমনাথের। ঊর্মি আর বাচ্চাদের ছবিতে মালা। রৌনককে বিছানায় শুইয়ে দিল। ফোনটা বেজে উঠল। পূর্বা। সোমনাথ যেন স্ব-ইচ্ছায় কেটে দিল।
ছায়ামূর্তি
আবু তাহের
ফাঁকা রাস্তা। বহরমপুর পেরিয়ে গঙ্গার ধার দিয়ে যাওয়ার সময় একটা মিষ্টি বাতাস চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে তিয়াষের। খবরের অফিসের কাজ তাঁর। রাতে একটা খবর সংগ্রহ করতে বেরিয়েছে। আকাশে মেঘ। এক্ষুনি যেন বৃষ্টি নামবে। গন্তব্যস্থল এখনও মিনিট পাঁচেকের রাস্তা। সে কি কোথাও দাঁড়িয়ে যাবে? কিন্তু রাস্তার ধারে সেরকম ছাউনি নেই। গোরাবাজার ঘাটের কাছে একটা ছাউনি অবশ্য রয়েছে। কিন্তু তাঁর কাজ তো সেদিকে নয়। ভাবতে ভাবতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল।
স্কোয়ারের পাশে একটা চায়ের দোকানে স্কুটিটা রেখে তিয়াষ বেঞ্চের উপর বসল। দোকানটা বন্ধ। বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ের ঝাপটায় ওই দোকানের ত্রিপলের ছাউনি আন্দোলিত হচ্ছে। বৃষ্টির ছাট এসে লাগছে গায়ে। খবর সংগ্রহের জন্য বেরিয়ে এরকমভাবে ফেঁসে যেতে হবে সে ভাবতে পারেনি। এই রাস্তায় কত মানুষের ভিড় থাকে অন্যসময়। এখন একেবারে নির্জন। হঠাৎ একটা আবছা ছায়ামূর্তি বিশ হাত দূরের জঙ্গলটার দিকে ঢুকে গেল নাকি! তিয়াষ একবার মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল।
ছায়ামূর্তিটা তাঁর কাছে চলে এসেছে। সাদা কাপড়ে মাথাটা ঢাকা, শীর্ণকায় চেহারা। কে যেন তিয়াষের পুরো শরীরটা বরফের চাঁইয়ের মধ্যে চুবিয়ে দিয়েছে। মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পারল তিয়াষ। এটা তো সেই লোকটা যাকে করোনা রোগী সন্দেহে শ্মশানে দাহ করতে দেয়নি পাড়ার ছেলেরা। ওকে নিয়েই তো খবর করেছিল তিয়াষ। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে তাঁর। একটু চা পেলে ভালো হত। অবয়বটা যেন ওর থেকে পাঁচ হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলল, ‘একটা খবর করতে পারবেন? তিনকড়ি এখনও বেঁচে আছে, করোনায় তাঁর মৃত্যু হয়নি!’
The publish অণুগল্প appeared first on Uttarbanga Sambad.
