রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: বাবাকে স্ট্রেচারে চাপিয়ে কোনওরকমে অন্তর্বিভাগ থেকে টেনে নিয়ে পিপিপি মোডের এক্স-রে বিভাগের (X-Ray Disaster NBMCH) সামনে এনে হতভম্ব মহম্মদ হানিফ। দেখেন, এক্স-রে বিভাগের সামনে লেখা, ‘মেশিন খারাপ’। শনিবার দুপুরে উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে এমন পরিস্থিতি দেখে কিছুটা উত্তেজিত হানিফ বলে ওঠেন, ‘এখানে দু’দিন ধরে মেশিন খারাপ। অথচ সিস্টার আমাদের এখানেই এক্স-রে করতে পাঠালেন। এখন আবার সুপারস্পেশালিটি ব্লকে টেনে নিয়ে যেতে হবে। এতটা দূরে ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে স্ট্রেচার টেনে নিয়ে যাওয়া ভীষণ কঠিন। কিন্তু উপায় তো নেই।’
বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে (পিপিপি) চলা এক্স-রে মেশিন দু’দিন ধরে খারাপ হয়ে পড়ে আছে। অথচ সুপারস্পেশালিটি ব্লকে থাকা সরকারি এক্স-রে চালু থাকছে মাত্র চার ঘণ্টা। আর এর জেরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা।
বহির্বিভাগের পাশাপাশি অন্তর্বিভাগ থেকেও রোগীদের বেসরকারি সংস্থায় এক্স-রে করাতে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু এখানে এক্স-রে মেশিন খারাপ থাকায় আবার রোগীকে অনেকটা দূরে থাকা সুপারস্পেশালিটি ব্লকে টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। মেডিকেলের সুপার ডাঃ সঞ্জয় মল্লিকের কথায়, ‘পিপিপি মোডের এক্স-রে ১৪ বছর ধরে পরিষেবা দিচ্ছে। পুরোনো মেশিন খারাপ হতেই পারে। আমরা পুরো বিষয়টি স্বাস্থ্য ভবনকে একাধিকবার জানিয়েছি। সরকারি এক্স-রে’তে অন্তর্বিভাগ এবং জরুরি ক্ষেত্রে পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে।’
মেডিকেলে দুটি ডিজিটাল এক্স-রে রয়েছে। একটি সুপারস্পেশালিটি ব্লকে সরকারিভাবে চলে। বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে (পিপিপি) অন্যটি রয়েছে জরুরি বিভাগের পাশে। সরকারি এক্স-রে পরিষেবা যেখানে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টে পর্যন্ত চালু থাকে, সেখানে পিপিপি মোডের এক্স-রে ২৪ ঘণ্টাই পরিষেবা দেয়। বহির্বিভাগ হোক বা অন্তর্বিভাগ, সিংহভাগ ক্ষেত্রেই রোগীকে পিপিপি মোডের এক্স-রে’তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পিপিপি মোডের এক্স-রে’তে প্রতিদিন ৪৫০-৫০০ জন রোগীকে পরিষেবা দেওয়া হয়। সেখানে সরকারি এক্স-রে’তে প্রতিদিন পরিষেবা পান মাত্র ১০০-১২০ জন।
কিন্তু পিপিপি মোডে চলা সংস্থার এক্স-রে মেশিন এতটাই পুরোনো হয়ে গিয়েছে যে সেটি প্রায়ই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। প্রতি মাসেই মেশিন ৭-১০ দিন করে খারাপ থাকায় মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠছে। কিন্তু কেন নতুন মেশিন আসছে না বা এজেন্সি বদলানো হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন উঠছে। পিপিপি মোডের এক্স-রে পরিচালকদের সূত্রে জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্য ভবনের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ অনেকদিন শেষ হয়ে গিয়েছে। তারপর থেকে পরিষেবা চালানোর জন্য দু’মাস করে বর্ধিত সময় দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সংস্থা নতুন মেশিন বসানোর ঝুঁকি নিচ্ছে না।
সুপারস্পেশালিটি ব্লকের সরকারি ডিজিটাল এক্স-রে কেন ২৪ ঘণ্টার জন্য চালু রাখা হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও উঠছে। মেডিকেল সূত্রে খবর, রেডিও ডায়াগনসিস বিভাগে পর্যাপ্ত পরিমাণে অধ্যাপক, চিকিৎসক, জুনিয়ার ডাক্তার, মেডিকেল টেকনলজিস্ট রয়েছেন। যা দিয়ে প্রতিদিন অন্তত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই পরিষেবা চালু রাখা যায়। কিন্তু এখানে সকাল ১০টায় এক্স-রে বিভাগ চালু হয়, বিকেল তিনটে বাজতে না বাজতেই কাজ শেষ করে এক্স-রে বিভাগের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
উত্তরবঙ্গ মেডিকেলের এক প্রশাসনিক আধিকারিকের বক্তব্য, অন্তর্বিভাগ, বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ রোগীর এক্স-রে করতে হয়। সরকারি ডিজিটাল এক্স-রে’র জন্য যে পরিকাঠামো রয়েছে, তা দিয়ে ইচ্ছে করলে ২৪ ঘণ্টাই পরিষেবা দেওয়া যায়। কিন্তু এখানে সেটা হচ্ছে না। অভিযোগ উঠছে, সমস্যাগুলি দেখার কেউ নেই। ফলে মানুষ ভুক্তভোগী হচ্ছেন।
