“তুমি কেন আর্জেন্টিনার ভক্ত?”
“মেসির জন্য।”
“আর স্পেন?”
“স্পেনকেও ভালো লাগে।”
“কেন?”
“বার্সেলোনার জন্য।”
“কেন বার্সেলোনার সমর্থক?”
“মেসির জন্য।”
কাল্পনিক কথোপকথন। কিন্তু প্রচণ্ডভাবে বাস্তব। বার্সেলোনা সমর্থকদের জন্য এ এক চক্রব্যূহ। আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন নয়। এ হল বার্সেলোনা বনাম বার্সেলোনা। একদিকে লিওনেল মেসি। স্পেনের ক্লাব ছেড়েছেন বহুদিন। তবু আজও তিনি ধারক-বাহক। অন্যদিকে ইয়ামাল, পাউ কুবারসি, পেদ্রি, গাভি, ওলমো, ফেরান তোরেস, এরিক গার্সিয়া, জোয়ান গার্সিয়া। বার্সেলোনা সমর্থকদের অবস্থা হল শ্যাম রাখি না কূল রাখি? আবার সুবিধাও আছে। বিশ্বকাপে সম্ভবত সবচেয়ে নিশ্চিন্ত মনে এই একটা ম্যাচই দেখতে পারবে। যেই জিতুক, আসল চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনাই!
আরও পড়ুন:
অনেকে বলেন, প্রাক্তনের কাছে ফিরতে নেই। কিন্তু স্মৃতি কী করে ভোলা যায়? বার্সেলোনা সমর্থকদের কাছে স্মৃতিটা অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। সেই স্মৃতির নাম লিওনেল মেসি। ২০২১ সালের কথা। আচমকা জানা গেল, চুক্তির জটিলতায় লিওনেল আন্দ্রেস মেসিকে ক্লাব ছাড়তে হচ্ছে। ধুর! এরকম আগেও শোনা গিয়েছিল। ভুল বিনিয়োগ, কোভিডের ধাক্কায় বার্সেলোনার অবস্থা তখন টালমাটাল। অনেকেরই বেতন বাকি। তবু মেসি ক্লাব ছাড়বেন এ হয় না। বার্সেলোনা তাঁর শৈশবের শিশুশয্যা, যৌবনের উপবন। সেই ২০০০ সালে লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে শুরু। ২০০৪ সাল থেকে লাল-নীল জার্সিতে ম্যাজিক শুরু।

কিন্তু না। আশঙ্কা সত্যি করে ক্লাব ছাড়লেন মেসি। কোটি কোটি মানুষের চোখের জলেও বাস্তবকে টলানো যায়নি। কে দায়ী, সেই নিয়ে কিছুদিন আলোচনা চলল। সময় নাকি সবকিছু ভুলিয়ে দেয়! কোভিডের জনবিচ্ছিন্ন দুনিয়ায় রুমালে চোখের জল মুছে মেসির বিদায়ের যন্ত্রণা আজও বুক মুছড়ে দেয় ‘কুলার্স’দের (বার্সেলোনা সমর্থকদের এই নামে ডাকা হয়)। মেসির বিদায়ের পর মুখ থুবড়ে পড়ল বার্সেলোনা। প্লেয়ার সই করানোর টাকা নেই। দলের মধ্যে ঝামেলা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে বিদায়ে ইউরোপা লিগও খেলতে হয়েছে।

তবে সময়ের গুণও আছে। সে কারও জন্য দাঁড়ায় না। টানা ধাক্কায় একসময় হুঁশ ফিরল বার্সেলোনার। আরে, কামব্যাকের উপায় তো ঘরেই আছে। যেখান থেকে উঠে এসেছিলেন মেসি, ইনিয়েস্তা, জাভি, পিকে, পুওল, ফ্যাব্রেগাসরা। বিশ্ব ফুটবলের সব থেকে বন্দিত অ্যাকাডেমি- ‘লা মাসিয়া’। যেখানের ফুটবলাররা স্পেনকে ইউরো, বিশ্বকাপ দিয়েছেন। বার্সেলোনাকে ভরিয়ে দিয়েছে সব ট্রফিতে। সেই অ্যাকাডেমিকে ভুলে ‘বাইরের’ প্লেয়ার কিনতে গিয়েই আরও বিপাকে পড়েছে বার্সেলোনা। এবারও ফের কাতালুনিয়ার ক্লাবকে বাঁচাতে এগিয়ে এল জোহান ক্রুয়েফের আদর্শ।

মাঝে জাভি কোচ হয়েছেন। প্লেয়ার এসেছে, গিয়েছে। বার্সেলোনা লা লিগা, কোপা দেল রে জিতেছে। অবশেষে ছন্দে ফিরছে। একের পর এক নতুন প্লেয়ার উঠে এসেছেন অ্যাকাডেমি থেকে। ইয়ামাল, গাভি, কুবারসি, ফেরমিন লোপেজ, আলেজান্দ্রো বালদে, মার্ক বার্নাল। আরও কিছু তরুণ প্রতিভা কিনে নিল বার্সেলোনা। হান্সি ফ্লিকের কোচিংয়েও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা হয়নি ঠিকই, তবে মেসি অধ্যায় ভুলে ঘর গুছিয়ে নিয়েছে। একদল নতুন মুখ এসেছেন, যাঁরা ‘মেস কিউ উন ক্লুব’ (ক্লাবের থেকেও বেশি) এই স্লোগান বহন করেন। এবার যখন স্পেনের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা হল, তাতে বার্সেলোনার ৮ জন। রিয়াল মাদ্রিদের একজনও নেই! এরকম ৮ জন ছিলেন ২০১০ বিশ্বকাপেও। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন।

এটা ঠিক যে, ভারতে স্পেনের অধিকাংশ সমর্থকই মূলত বার্সেলোনার ভক্ত। বা বলা যায়, সেই কারণেই স্পেনের প্রতি দুর্বলতা। একটা স্বপ্নের দল, তিকিতাকার মায়া আজও ভোলা অসম্ভব। এবার বিশ্বকাপ জিতলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে খোঁচা দেওয়া যাবে। মাদ্রিদ সমর্থকরাও উভয় সংকটে পড়বেন। এর চেয়ে বড় সুখের সময় হয়?
কিন্তু, মাঝে একজনই বাধা। তার নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুকিত্তিনি। আজও তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে ধরা। যেন তিনি কোথাও যাননি। আজও বার্সেলোনাতেই আছেন। কে জানত, ফাইনালে ‘বরপুত্র’দের মুখোমুখি হবেন মেসি? ইয়ামালকে স্নান করানোর ছবি নিয়ে তো কিছু বলার নেই। গাভি, ওলমো, কুবারসি- সবার সঙ্গে মেসির ছবি রয়েছে। সকলেই মেসির ভক্ত। এক অর্থে ভক্ত বনাম ‘ঈশ্বর’! বার্সেলোনা সমর্থকদের একটা সুবিধা হচ্ছে, তারকাপ্রেমে তাঁদের ক্লাব বদলাতে হয়নি। আজ ইংল্যান্ড, কাল ইটালি, পরশু স্পেন করতে হয়নি। একটাই ক্লাব। যে ক্লাবের সর্বস্ব জুড়ে আছেন মেসি। ঘরের মাঠ ন্যু ক্যাম্প স্টেডিয়াম যখন নতুন করে সাজিয়ে তোলা হয়, তখন একদিন সেখানে চুপিসারে আসেন মেসি। কেউ জানতেও পারেননি। এ যেন দৈবলিখন। তাঁর পাদস্পর্শ ছাড়া বার্সেলোনার নতুন যাত্রা শুরু হতে পারে না। আর আশ্চর্যের বিষয়, তারপর থেকে ন্যু ক্যাম্পে বার্সেলোনা ম্যাচ হারেনি। এই তো ফাইনালের আগে যখন তাঁকে ইয়ামাল সম্পর্ক জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি বলেন, “ইয়ামালকে ভালো লাগে, কারণ ও আমার প্রিয় ক্লাবে খেলে।” বিশ্বে কটা ক্লাবের সমর্থক এই ভালোবাসা নিয়ে চলতে পারে?
সেই ভালোবাসার আজ পরীক্ষা। আমেরিকার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসি বনাম বার্সেলোনার ‘ভক্ত’রা। সমর্থকরা দ্বন্দ্বে। আবার খুশিও। স্পেন জিতলে জিতবে বার্সেলোনার আগামী প্রজন্ম। মেসি জিতলে জিতবে ক্লাবের প্রতি সব ভালোবাসা। দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও আসলে জিতে যাবেন বার্সেলোনা সমর্থকরাই।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
