অরুণ ঝা ও মনজুর আলম, চোপড়া: দিনমজুর মহম্মদ ইলিয়াস যেন গোটা চোপড়ার পরিস্থিতির নির্যাসটুকু বলে দিলেন। অন্যের জমিতে কাজ করেন বছর পঁয়ষট্টির মহম্মদ ইলিয়াস। এক হাতে সারভর্তি ব্যাগ। কমলাগাঁও সুজালি অঞ্চলের বেলঝাড়ি মোড়ে ভোটের কথা তুলতে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘চোপড়ায় আবার গণতন্ত্র আছে নাকি! বরং ফতোয়ার সন্ত্রাস আছে। ভোট বলে কিছু নেই (West Bengal Election 2026)।’
বলেই চারপাশ দেখে আলপথ ধরে দ্রুত জমিতে নেমে গেলেন ইলিয়াস। তাঁর কথায় সিলমোহর পড়ল ললিতগছ এলাকার এক তৃণমূল কর্মী বাদল দাসের মন্তব্যেই। অলস দুপুরে বাঁশের মাচায় বসে ঝিমোচ্ছিলেন। ভোটের খোঁজখবর করছি শুনে বললেন, ‘আরে মশাই, এই এলাকায় তৃণমূল আমিই প্রথম শুরু করেছিলাম। অথচ গত বিধানসভা ভোটে আমার ভোট আমাকে দিতে দেয়নি। অন্য কেউ দিয়েছে।’
বলেননি কাউকে? নেতৃত্বকে জানাননি? খোদ তৃণমূল কর্মী বাদলের গলায় হতাশা, ‘প্রতিবাদ করলেই সন্ত্রাসের কবলে পড়ব। তাই নীরব আছি।’ কার্যত বিরোধীশূন্য বটে চোপড়া বিধানসভা এলাকা। কিন্তু মানুষই যেন বিরোধী হয়ে উঠেছে। গ্রামে গ্রামে ‘ইনসাফ’ আকাঙ্ক্ষার চোরাস্রোত তৃণমূলের কাঁটা হয়ে উঠতে পারে চোপড়ায়।
লক্ষ্মীপুর ঢোকার আগে ফতেপুর মোড়ের চায়ের দোকানে আলাপচারিতায় রফিকুল ইসলামের কথায় সেই মনোভাবের স্পষ্ট প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘মানুষ ইনসাফ চাইছে। কিন্তু বিকল্প যে কেউ নেই। গত পঞ্চয়েত ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পঞ্চায়েত পদাধিকারীরা সিলেক্টেড হয়েছিলেন। তাঁদেরও গুরুত্ব নেই। সবটাই আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করে মার্কামারা সমাজবিরোধীরা।’
ইনসাফের এই প্রার্থনার পাশাপাশি চোপড়ায় তৃণমূলের গোদের উপর বিষফোড়া গোষ্ঠী কাজিয়া। চোপড়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল বিধায়ক হামিদুল রহমানকে প্যাঁচে ফেলতে তলে তলে দলে তাঁর বিরোধীরাই একজোট হওয়ার ফর্মুলা ঠিক করতে কথা চালাচালি শুরু করেছেন। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক হানাহানির অন্যতম হটস্পট সুজালি এবং পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুর অঞ্চল। সুজালি এবং গোবিন্দপুর অঞ্চল চোপড়া বিধানসভার অধীনে থাকলেও ইসলামপুর ব্লকের অধীন। ঘাসফুল শিবিরের চোপড়া বনাম ইসলামপুর লবির লড়াই গত তিন বছরে ভিন্নমাত্রা নিয়েছে।
এই দুটি অঞ্চল পুরোপুরি ইসলামপুর লবির নিয়ন্ত্রণে। ফলে এই দুটি অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার ভোট কার ঝুলিতে যাবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। লালবাজার এলাকায় এক ব্যবসায়ী কথায় কথায় বলে উঠলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে আমরা বন্দিদশায় আছি। চোপড়ার মানুষ ভোটাধিকার ভুলতে বসেছে।’ তাঁর মুখে ইনসাফের কথা। তিনি বলেন, ‘ভোট স্বচ্ছতার সঙ্গে হলে এবার ন্যায়বিচার হবে আশা করি।’
দাসপাড়া, ঘিরনিগাঁও ইত্যাদি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার ছবি একইরকম। মুখ খুলে সন্ত্রাস ডেকে আনতে রাজি নন স্থানীয়রা। ধিয়াগর এলাকায় এক ঠিকাদারের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত। ‘মুখ খোলায় শাসকদলের নেতারা আমার দুটি জমি অল্প মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করেছেন’- জানালেন তিনি। তাঁর মুখেও শোনা গেল, ‘এবার আশা করি ইনসাফ হবে।’
বিরোধীশূন্য চোপড়ায় ইনসাফের আশা কীসের ভিত্তিতে? ওই ঠিকাদারই জানালেন, তৃণমূলে হামিদুল বিরোধীরা একের পর এক গোপন বৈঠক সেরে ফেলেছেন। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া, গোষ্ঠী কাজিয়া ছাড়া মানুষের মনে শাসক বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে বালি পাচারে মাফিয়াগিরি, ঠিকাদারদের কাজ বণ্টনে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে প্রভাবশালী তৃণমূল নেতাদের খুল্লম খুল্লা স্বজনপোষণে।
সোনাপুর, হাপতিয়াগছ, মাঝিয়ালি সহ সর্বত্র বালি মাফিয়াদের দাপট, কাটমানির দৌরাত্ম্য। মুখ খুললে বা বিরোধিতা করলে চা বাগান দখল, লক্ষ লক্ষ টাকা জরিমানা ইত্যাদি একের পর এক ঘটনায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। এলাকার এক তরুণের ভাষায়, ‘খোঁজ নিন, জেেন যাবেন, কাটমানি ছাড়া কারও অ্যাকাউন্টে আবাস যোজনায় বরাদ্দ জমা পড়ে না। জমা পড়লে নেতাদের লোক দিনে একাধিকবার বাড়িতে এসে তাগাদা দেয়।’
সন্ধ্যায় হাপতিয়াগছ, চিতলঘাটা এলাকায় বালিভর্তি ডাম্পারের লাইন। মহানন্দা ও ডক নদীর বুক খুবলে রাখা বালির পাহাড় যত্রতত্র। প্রতিবাদ করার সাহস নেই কারও। আগ বাড়িয়ে গল্প করার চেষ্টা করতে সোনাপাতিলা গ্রামে রাজ্য সড়কের পাশে ঝাড় থেকে বাঁশ কাটতে ব্যস্ত সত্তর ছুঁইছুঁই মহম্মদ খলিলুর সন্দেহের চোখে জরিপ করলেন। পরে বলে ফেললেন বটে, ‘ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না’, কিন্তু দূর থেকে দুটি বাইকে চারজনকে আসতে দেখে আবার বাঁশ কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
বাইক আরোহী চার তরুণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বেরিয়ে যাওয়ায় চাপা সন্ত্রাস বোঝাই গেল। তবুও বোমা-বন্দুকের দাপট এবং রাজনৈতিক খুনের সাক্ষী চোপড়ায় পরিবর্তনের চোরাস্রোতকে উসকে দিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন তৃণমূলের কোণঠাসা হয়ে থাকা নেতারা। এমনই এক বিক্ষুব্ধ নেতার কথায়, ‘বারুদের গন্ধের জবাব দিতে চোপড়া এবার প্রস্তুত। গণতন্ত্রের শাসন ফিরে পেতে সাধারণ মানুষ তৈরি। ভোটটা দিতে পারলে খেলা ঘুরে যাবে।’
কিন্তু ভোটটা দিতে পারবেন তো? সেটাই এখন প্রশ্ন চোপড়ায়।
