নয়াদিল্লি ও কলকাতা: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ওয়াকফ সম্পত্তি (Waqf Property) নথিভুক্তিকরণের জন্য ৬ মাস সময় দিয়েছিল কেন্দ্র। ৬ ডিসেম্বর সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। সোমবার প্রকাশিত সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রকের তথ্য বলছে, ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তির জন্য তৈরি ‘উম্মেদ’ (ইউনিফায়েড ওয়াকফ ম্যানেজমেন্ট, এমপাওয়ারমেন্ট, এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) পোর্টালে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায় সম্পন্ন হয়েছে। ৬ মাসে মোট ৫,১৭,০৪০টি ওয়াকফ সম্পত্তির তথ্য পোর্টালে আপলোড করা হয়েছে। যার মধ্যে ২,১৬,৯০৫টি সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারা অনুমোদিত হয়েছে। উম্মেদ পোর্টালে এই বিশাল সংখ্যক সম্পত্তি নথিভুক্ত করার উদ্দেশ্য হল, ওয়াকফ সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে চলা দুর্নীতি রোধ এবং এই সম্পদগুলিকে উন্নয়নমূলক কাজে লাগানো।
কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ৬ জুন উম্মেদ পোর্টালটি চালু করেছিলেন। ৬ ডিসেম্বর রাত ১২টায় এটি বন্ধ হয়ে যায়। মন্ত্রক জানিয়েছে, সময়সীমা শেষ হওয়ার আগের কয়েকদিন নিবন্ধনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল। বর্তমানে ২,১৩,৯৪১টি সম্পত্তি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং যাচাইকরণের সময় ১০,৮৬৯টি সম্পত্তি বাতিল করা হয়েছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, সময়সীমা বাড়ানো সম্ভব না হলেও, পরবর্তী তিন মাসের জন্য কোনও জরিমানা বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
পোর্টালে সবচেয়ে বেশি ওয়াকফ সম্পত্তির নিবন্ধন হয়েছে উত্তরপ্রদেশ থেকে। ৯২,৮৩০টি। এরপর রয়েছে মহারাষ্ট্র (৬২,৯৩৯টি) এবং কর্ণাটক (৫৮,৩২৮টি)। পশ্চিমবঙ্গের ৩২,৩৪২টি সম্পত্তি কেন্দ্রীয় পোর্টালে নথিভুক্ত হয়েছে। যদিও সম্পত্তি সংখ্যার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ দেশে দ্বিতীয় (উত্তরপ্রদেশের পরেই), যেখানে ৮০,৪০০-র বেশি সম্পত্তি রয়েছে। কেন্দ্রীয় পোর্টালে সেইসব সম্পত্তি নথিভুক্তির গতি অত্যন্ত শ্লথ।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যে ৮ হাজার ওয়াকফ এস্টেটে মোট ৮২ হাজার সম্পত্তি রয়েছে। তার অর্ধেকের কম কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে হুগলি জেলায়। সেখানে ৮৪৫টি এস্টেটে ১০,৪৯৫টি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। সবচেয়ে কম ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে কালিম্পংয়ে। মাত্র ১টি। উত্তর দিনাজপুরের ৬২টি ওয়াকফ এস্টেটে ৮৩৬টি সম্পত্তি রয়েছে। তার মাত্র ২২২টি সেন্ট্রাল পোর্টালে আপলোড হয়েছে। দার্জিলিং-এর ১২টি ওয়াকফ এস্টেটে ৯৩টি সম্পত্তি রয়েছে। তার মধ্যে ২৩টি কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড হয়েছে। জলপাইগুড়িতে ৯০টি ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে। ১,৫৭৭টি সম্পত্তির মধ্যে আপলোড হয়েছে ৩৪৪টি। কোচবিহারের ১৪টি এস্টেটের ২,১০০টি সম্পত্তির মধ্যে ৪১২টি পোর্টালে তোলা সম্ভব হয়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে ১৭০টি ওয়াকফ এস্টেটের ২,৬৩৭টি সম্পত্তির মধ্যে ৫৭৭টির তথ্য কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড হয়েছে। বিশেষ সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারকে সময় বাড়ানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র সেই সময়সীমা বরাদ্দ করলে বাকি সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য পোর্টালে তোলা হবে।
মুর্শিদাবাদ ও মালদায় বেশ কয়েকটি শতাব্দীপ্রাচীন ওয়াকফ সম্পত্তির দলিল, সীমানা নির্ধারণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় সময়মতো কেন্দ্রীয় পোর্টালে তথ্য দেওয়া কঠিন হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। অনেক জেলায় আপলোডের সময়সীমা পার হওয়ার পরও বিশেষ কেন্দ্র চালু করে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়ায় গতি আনতে কেন্দ্র দেশজুড়ে প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ এবং একটি ডেডিকেটেড হেল্পলাইন স্থাপন করেছে।
ওয়াকফ সংশোধিত বিলটি লোকসভায় ২৮৮-২৩২ ভোটে এবং রাজ্যসভায় ১২৮-৯৫ ভোটে পাশ হওয়ার পরে এটি আইনে পরিণত হয়েছে। পরে এই আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। শীর্ষ আদালত আইনটিকে অসাংবিধানিক না বললেও এর দুটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানায়। প্রথমত, আইনে বলা হয়েছিল, কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ কি না তা জেলা শাসক বা সম-পদমর্যাদার কোনও আধিকারিক ঠিক করতে পারেন।
আদালত মনে করে, এই কাজ জেলা শাসকের নয়, আদালতের কাজ। দ্বিতীয়ত, আইনে বলা হয়েছে, যিনি ওয়াকফে দান করবেন, তাঁকে অন্তত পাঁচ বছর ইসলাম ধর্ম পালনের প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু এটি কার্যকর করার কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম সরকার বানায়নি। এই দুটি ধারা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও উম্মেদ-এর মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির ডিজিটাল নথিভুক্তিকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করা হচ্ছে।
