উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: পায়ের চামড়ার নীচে আঁকাবাঁকা শিরার ফুলে ওঠা সমস্যার নামই ভেরিকোজ ভেইন (Varicose Veins)। দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে, অতিরিক্ত ওজন হলে বা পরিবারে কারও থাকলে এমন সমস্যা হতে পারে। রোগটা বুঝবেন কী করে, চিকিৎসাই বা কী – জানালেন বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হেলথ সিটির ভাসকুলার ও এন্ডোভাসকুলার সার্জন ডাঃ প্রসেনজিৎ সূত্রধর।
হার্ট থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত শরীরের অন্যান্য অংশে নিয়ে যায় ধমনী আর শিরা সেই অক্সিজেনহীন রক্ত আবার হার্টে ফিরিয়ে আনে। ভেরিকোজ ভেইন হল ফুলে যাওয়া শিরা যা ত্বকের নীচে দেখা যায়। এগুলো সাধারণত নীলচে, মোটা ও প্যাঁচানো আকারের হয়। চিকিৎসা না করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো আরও খারাপ হতে পারে। কিছুক্ষেত্রে ভেরিকোজ ভেন হতে পারে গভীর শিরায় পুরোনো জমাট বাঁধা রক্তের ইঙ্গিত।
আমাদের পায়ে তিন প্রকার শিরা থাকে – সুপারফিশিয়াল ভেনস যা ত্বকের কাছাকাছি থাকে, ডিপ ভেনস যা পেশির ভেতরে থাকে এবং পারফোরেটিং ভেনস যা উপরিভাগের শিরাকে গভীর শিরার সঙ্গে যুক্ত করে। ভেরিকোজ ভেন সাধারণত পায়ের উপরিভাগের শিরাগুলিতে দেখা যায়।
কেন হয়
পায়ের উপরিভাগের শিরায় রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে ভেরিকোজ ভেন হয়।
উপসর্গ
পায়ে ব্যাথা, জ্বালাভাব বা ভারী লাগা, যা সাধারণত দিনের শেষে বা দীর্ঘ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে বাড়ে। হালকা ফোলা, বিশেষ করে পা ও গোড়ালিতে। আক্রান্ত শিরার ত্বকে চুলকানি। এছাড়া গুরুতর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে – গোড়ালি বা নীচের পায়ের ত্বকে কালচে বা গাঢ় দাগ, শুকনো ত্বক, ফুলে যাওয়া, শিরায় প্রদাহ বা রক্ত জমাট, ঘা যা দীর্ঘদিনেও সারে না, অল্প আঘাতে রক্তপাত বা কালশিটে পড়া, ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ।
রোগনির্ণয়ের উপায়
এক্ষেত্রে চিকিৎসক আপনাকে ভেনাস ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করাতে বলতে পারেন। এর মাধ্যমে রক্ত লিক হওয়ার উৎস জানার পাশাপাশি চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণও সহজ হবে। এই ধরনের পরীক্ষা ব্যথাহীন এবং খেয়েই করা যেতে পারে।
পাশাপাশি সার্জন আপনার বর্তমান ও অতীতের উপসর্গ সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন এবং আপনার সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করবেন। তিনি আপনার পা পরীক্ষা করে দেখবেন কোন কোন জায়গায় শিরা ফুলে আছে এবং কোনও জটিলতা রয়েছে কি না। প্রয়োজনে পুরো পা (ঊরু পর্যন্ত) পরীক্ষা করা হতে পারে, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপরের উরুর ভালব লিক করায় ভেরিকোজ ভেইন তৈরি হয়।
চিকিৎসা
কমপ্রেশন স্টকিংস – এটি একটি শক্ত ইলাস্টিক মোজা যা পায়ের শিরাগুলোকে চেপে ধরে রক্তকে বিপরীত দিকে প্রবাহিত হওয়া রোধ করে।
এন্ডোভেনাস ট্রিটমেন্ট – এটি ‘ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি’ বা ‘িক-হোল-সার্জারির’-র মতো একটি আধুনিক পদ্ধতি। একটি সরু নল (ক্যাথেটার) পায়ের শিরায় প্রবেশ করিয়ে লেজার বা রেডিও ওয়েভের মাধ্যমে শিরার ভেতরের দেওয়াল গরম করে বন্ধ করা হয়। এতে শিরার বিপরীতমুখী রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ভেরিকোজ ভেন নিরাময় হয়।
এই পদ্ধতিটি সাধারণ সার্জারির তুলনায় বেশি আরামদায়ক এবং সাধারণত প্রথমে এই বিকল্পটি দেওয়া হয়। এটি সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়াতেই করা যায়। অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একই দিনে বাড়ি ফেরা যায়। পরের দিন থেকেই হাঁটা ও কাজ শুরু করা সম্ভব। কয়েকদিন পায়ে হালকা টান বা কালশিটে পড়তে পারে। প্রয়োজনে এই মাইক্রো-ফ্লেবেকটমি বা স্ক্লেরোথেরাপির সঙ্গে মিলিয়ে করা যেতে পারে।
মাইক্রো–ফ্লেবেকটমি – এই পদ্ধতিতে পায়ের মোটা ফুলে যাওয়া শিরাগুলো ছোট ছোট ছিদ্র (কয়েক মিলিমিটার) করে অপসারণ করা হয়। সাধারণত এটি এন্ডোভেনাস ট্রিটমেন্টের সঙ্গে একত্রে করা হয়। প্রথমটি মূল লিক বন্ধ করে এবং এই পদ্ধতিটি বাকি অস্বাভাবিক শিরা সরিয়ে দেয়।
স্ক্লেরোথেরাপি – এই প্রক্রিয়ায় ডাক্তাররা শিরায় ইনজেকশন দেন। এটি শিরাটি বন্ধ করে দেয় যাতে রক্ত আর সেখানে প্রবাহিত না হয়। রক্ত তখন অন্য সুস্থ শিরা দিয়ে হার্টে ফিরে যায় এবং শরীর ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিরাগুলো শোষণ করে ফেলে।
ঝুঁকির কারণ
পরিবারে কারও ভেরিকোজ ভেন থাকলে, অতিরিক্ত ওজন হলে, ব্যায়ামের অভাব, ধূমপান, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে, ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (ডিভিটি) থাকলে ভেরিকোজ ভেন হতে পারে। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি বেশি। অতিরিক্ত ওজন, গর্ভাবস্থা বা এমন পেশা যেখানে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় – পায়ের শিরায় চাপ বাড়ায়। মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিকের আগে বা চলাকালীন সময়ে উপসর্গগুলি আরও তীব্র হতে পারে।
