সানি সরকার ও প্রণব সূত্রধর, শিলিগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার: নিউ জলপাইগুড়ি জংশন থেকে শিয়ালদা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মাঝে দার্জিলিং মেলের স্টপ ক’টা? যে কোনও যাত্রীর উত্তর হবে চারটি। তালিকা হাতে ধরিয়ে দেওয়ার পরেও এমন প্রশ্ন যদি করা যায় বন্দে ভারত (Vande Bharat) স্লিপার নিয়ে! যে কেউ ভিরমি খাবে। কেননা, শুক্রবার রেল বোর্ডের তরফে পূর্ব রেল ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলকে যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, তাতে স্টপ গুনে শেষ করা যায় না। যে কারণে সেমি হাইস্পিড ট্রেনটির চাকা গড়ানোর আগে অনেকেই স্লিপারটিকে ‘বন্দে ভারত লোকাল’ বলে ডাকা শুরু করে দিয়েছেন। ১৭ জানুয়ারি মালদায় দেশের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপারকে (কামাখ্যা-হাওড়া) সবুজ পতাকা দেখাবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দক্ষিণ ভারতের পরিবর্তে ভোটমুখী বাংলা ও অসমকে প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার দেওয়ার মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়েছিল কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকা বিজেপির ভোট অঙ্ক। শুক্রবার স্টপের তালিকায় তা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রথমে রেল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কামাখ্যা এবং হাওড়ার মাঝে ট্রেনটি দাঁড়াবে নিউ বঙ্গাইগাঁ, নিউ কোচবিহার, নিউ জলপাইগুড়ি, মালদা টাউন, আজিমগঞ্জ ও ব্যান্ডেলে। এই তালিকা প্রকাশ্যে আসার পরই নিজের কেন্দ্রে ট্রেনটির স্টপ চেয়ে দরবার শুরু করে দেন মনোজ টিগ্গা, জয়ন্ত রায়, কার্তিক পালদের মতো বিজেপির সাংসদদের পাশাপাশি কয়েকজন বিধায়ক। ভোটের কথা সরাসরি না লিখলেও, ট্রেনটি অত্যন্ত প্রয়োজন বলে অনেকেই চিঠি পাঠান রেলমন্ত্রকে। রাজ্য নেতারাও ভোটের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে। শুক্রবার স্পষ্ট, কাউকে নিরাশ করেননি রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণো। কেননা, কামাখ্যা ও হাওড়া ধরলে দেশের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনটি দাঁড়াবে ১৫টি স্টেশনে। ওই তালিকা অনুসারে, বঙ্গাইগাঁর সঙ্গে অসমে শুধু যুক্ত হয়েছে রঙ্গিয়া। কিন্তু বাংলায় নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে নিউ আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি রোড, আলুয়াবাড়ি রোড, নিউ ফরাক্কা, কাটোয়া, নবদ্বীপ ধাম। স্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে কৃতিত্বের দড়ি টানাটানিও শুরু হয়ে গিয়েছে। যেমন ট্রেনটির স্টপ চেয়ে তাঁরা যে আলিপুরদুয়ারের ডিআরএমকে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন, তা শুক্রবার মনে করিয়ে দিয়েছেন এখানকার বিধায়ক তৃণমূলের সুমন কাঞ্জিলাল। পালটা সাংবাদিক বৈঠক করে একই দাবি করেন বিজেপির জেলা সভাপতি মিঠু দাস। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের সিনিয়ার ডিসিএম আশিফ আলি শুধু বলছেন, নিউ আলিপুরদুয়ারে স্টপের কথা ঘোষণা হয়েছে।’
এই অতিিরক্ত স্টপের ফলে কী হবে? গতি কমবে ট্রেনটির। অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ‘গতিহীন’ ট্রেনটির সফর করবেন যাত্রীরা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শিয়ালদায় পৌঁছাতে দার্জিলিং মেলে সময় লাগে ১০ ঘণ্টার সামান্য বেশি। বন্দে ভারত স্লিপারের ক্ষেত্রে এনজেপি-হাওড়া যেতে সময় লাগবে ৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। উল্লেখ্য, নিউ জলপাইগুড়ি-হাওড়া চেয়ারকার বন্দে ভারতে বর্তমানে সময় লাগছে প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা। অর্থাৎ, ‘বিজেপির ভোট অঙ্কে’ স্লিপারে এক ঘণ্টারও বেশি সময় খরচ করতে হবে যাত্রীদের। শিল্পপতি সঞ্জিত সাহা বলছেন, ‘তাহলে তো যতটা ঢাক বাজানো হয়েছিল, চমক দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে ততটা হচ্ছে না। চমক শুধুই ভোটের। বেশি টাকা করে কেন কচ্ছপের গতির ট্রেনে উঠব?’
তবে ভোটের পর সব স্টপ থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা, উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের এক আধিকারিক বলছেন, ‘কোন স্টেশন থেকে কত টিকিট বিক্রি হচ্ছে, তা নিশ্চয়ই পরবর্তীতে দেখা হবে এবং স্টপ নির্ধারিত হবে।’
