সায়নদীপ ভট্টাচার্য, তুফানগঞ্জ: সকাল দশটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসা পরিষেবা পেলেও পেতে পারেন। তারপর গেলে দেখা যাবে তালাবন্ধ ঘর। এমনই পরিস্থিতি মারুগঞ্জ গ্রাম পঞ্চায়েতের মরাডাঙ্গা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের (Maradanga Main Well being Middle)। পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, নেই চিকিৎসা পরিকাঠামোও। অনেকটা ঢালতরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দারের মতো। সর্দি, জ্বর, ডায়ারিয়া বা চর্মরোগের মতো সাধারণ রোগের চিকিৎসা কোনওভাবে সম্ভব হলেও সামান্য গুরুতর অসুখ বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয়দের ভরসা জেলা সদর কোচবিহার বা মহকুমা শহর তুফানগঞ্জ (Tufanganj)।
মরাডাঙ্গায় একটিমাত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অথচ সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৪০-৫০ হাজার মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পরিষেবার খামতি থাকায় ন্যূনতম চিকিৎসাটুকুও অনেক সময় মেলে না।
ভেলাকোপা গ্রামের বাসিন্দা নুর মহম্মদের গলায় বিরক্তির সুর স্পষ্ট। বললেন, ‘আমাদের পরিবারের কারও দরকার পড়লে আমরা কখনও মরাডাঙ্গা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাই না। সোজা কোচবিহারে চলে যাই। সেখানে গিয়ে তো চিকিৎসককে পাওয়া যায় না।’
এলাকার অনেকেই একই কথা বললেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তো সবসময় চিকিৎসককে পাওয়া যায় না। আবার সব চিকিৎসাও হয় না। তাহলে শুধু শুধু সেখানে গিয়ে কী লাভ? তার চেয়ে কোচবিহার বা তুফানগঞ্জে চলে যাওয়াই ভালো।
চিলাখানার বাসিন্দা সুরজ কর্মকার সপ্তাহখানেক আগের অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন। তিনি বলেন, ‘বিকেলের দিকে কোচবিহার-তুফানগঞ্জ জাতীয় সড়কের চিলাখানায় একটি সাইকেল এবং বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তড়িঘড়ি রক্তাক্ত সাইকেলচালককে উদ্ধার করে জাতীয় সড়কের ধারে থাকা মরাডাঙ্গা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্র তালাবন্ধ থাকায় পরে এমজেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা চাই দুপুরের পরেও অন্তত জরুরি বিভাগ চালু থাকুক।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত ওষুধও মজুত নেই। প্রয়োজনীয় পরীক্ষানিরীক্ষা হয় না। ফলে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক বা দূরের সরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। এই যাতায়াতের খরচ অনেকের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। গর্ভবতী, বৃদ্ধ, শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। অত দূরে যাওয়ার আগেই অনেকের পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
এমনকি প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটারও আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা। দশটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক থাকেন। তারপর আর চিকিৎসকের দেখা মেলে না। নার্স রয়েছেন চারজন। এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নত করতে হলে প্রথমেই চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়াতে হবে বলে দাবি তাঁদের। যদিও এ বিষয়ে জানতে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক হিমাদ্রিকুমার আড়িকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
নাটাবাড়ি বিধানসভার বিধায়ক গিরিজাশংকর রায় অবশ্য বলেন, ‘বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। মারুগঞ্জের মানুষ যাতে যথাযথ চিকিৎসা পরিষেবা পান, সেদিকে আমরা নজর রাখব।’
পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা জরুরি পরিষেবা চালু করতে হবে বলেও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি ও নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজনও জরুরি। কিন্তু কবে এইসব পরিষেবা মিলবে, তা নিয়ে সংশয়ে স্থানীয়রা।
