উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ ডাক্তার হওয়ার প্রবল ইচ্ছা, কিন্তু প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে বারবার হোঁচট খাওয়া (Training Stress)। সেই ব্যর্থতার গ্লানি আর ডাক্তার হওয়ার অন্ধ জেদ থেকে এক তরুণ যে চরম পথ বেছে নিতে পারেন, তা কল্পনা করাও কঠিন। উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে ঠিক তেমনই এক অভাবনীয় ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। প্রতিবন্ধী কোটা (Disabled Quota) ব্যবহার করে এমবিবিএস (MBBS) কোর্সে ভর্তি হওয়ার লক্ষ্যে নিজের পা নিজেই কেটে ফেলেছেন এক যুবক। শুধু তাই নয়, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তিনি রীতিমতো সাজানো এক ‘গল্প’ শুনিয়েছিলেন পুলিশকে।
ঘটনাটি ঘটেছে জৌনপুরের লাইন বাজার থানা এলাকার খলিলপুরে। ২৪ বছর বয়সী সুরজ ভাস্কর ডি-ফার্মা পাশ করার পর গত তিন বছর ধরে এমবিবিএস-এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গত ১৮ জানুয়ারি রাতে তিনি তাঁর নির্মীয়মাণ বাড়িতে একাই ঘুমোচ্ছিলেন। পরদিন সকালে তাঁর বাঁ পায়ের চারটি আঙুল কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। সুরজ দাবি করেন, মাঝরাতে দুই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি এসে তাঁর ওপর হামলা চালায় এবং তাঁকে মারধর করে অজ্ঞান করে দেয়। জ্ঞান ফিরলে তিনি দেখেন তাঁর পায়ের আঙুল কাটা। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এলাকায় আলো জ্বালানো নিয়ে বিবাদের জেরে কিছু লোক তাঁকে হুমকি দিয়েছিল এবং তারাই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে।
পুলিশ প্রথমে খুনের চেষ্টার মামলা রুজু করলেও তল্লাশিতে নেমে আধিকারিকদের খটকা লাগে। ঘটনাস্থল থেকে কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন মেলেনি, বরং উদ্ধার হয় একটি করাত মেশিন (Noticed Machine), অ্যানাস্থেসিয়ার (Anesthesia) শিশি এবং ব্যবহৃত সিরিঞ্জ। জৌনপুরের সিটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ গোল্ডি গুপ্তা জানান, সুরজের কল ডিটেইলস (CDR) এবং ফরেনসিক পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেই রাতে বাড়িতে কোনো বহিরাগত প্রবেশ করেনি।
জেরার মুখে ও পারিপার্শ্বিক তথ্যের ভিত্তিতে অবশেষে আসল সত্য বেরিয়ে আসে। জানা যায়, ডি-ফার্মা পড়ার সুবাদে সুরজের চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাথমিক জ্ঞান ছিল। সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়েই তিনি নিজেই নিজের পা অবশ করে করাত দিয়ে আঙুলগুলো কেটে ফেলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, এর ফলে তিনি সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী হিসেবে গণ্য হবেন এবং এমবিবিএস-এর সংরক্ষিত কোটায় খুব সহজেই ডাক্তারিতে সুযোগ পাবেন।
সুরজের কাছ থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার করেছে পুলিশ, যেখানে লেখা ছিল— “২০২৬ সালের মধ্যে যেভাবেই হোক এমবিবিএস-এ ভর্তি হতে হবে।” পুলিশি তদন্তে আরও জানা যায়, এই ভয়ংকর পরিকল্পনার কথা তিনি আগেই তাঁর বান্ধবীকে জানিয়েছিলেন। এমনকি অক্টোবর মাসে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে (BHU) গিয়ে প্রতিবন্ধী কোটার খুঁটিনাটি নথিপত্রও সংগ্রহ করেছিলেন তিনি।
পুলিশের মতে, পড়াশোনার প্রচণ্ড চাপ এবং লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ার মানসিক অবসাদই সুরজকে এই আত্মঘাতী জালিয়াতির পথে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তবে এই ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার এক অন্ধকার দিক তুলে ধরেছে। সাফল্যের নেশায় একজন মেধাবী ছাত্রও কীভাবে অপরাধের পথে পা বাড়িয়ে নিজের শরীরের অঙ্গহানি ঘটাতে পারেন, তা সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
