নীহাররঞ্জন ঘোষ, মাদারিহাট: তোর্ষা নদী থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে টোটোদের নতুন ঠিকানা নুবিগ্রাম। বর্তমানে যা কুয়াপানি নামে পরিচিত। এখানে একসময় টোটোদের পূর্বপুরুষরা বসবাস করতেন। ২০২২ সালের পর টোটোরা এখানে অনেকেই টংঘরের আদলে বাড়ি তৈরি করেছেন। তবে, পূর্বপুরুষের জমির দখল নিলেও সেই জমির পাট্টা পাননি টোটোরা (Toto Tribe)।
টোটোদের তরফে প্রাক্তন ব্যাংক ম্যানেজার ভক্ত টোটো জানিয়েছেন, একসময় বন দপ্তর থেকে অবৈধভাবে টোটোদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। হাতির পিঠে চড়ে বনকর্মীরা এসে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল তাঁদের। বন দপ্তরের ধারণা ছিল ওই জমি তাদের। প্রায় ৭০ বছর পর সেই জমি পুনরুদ্ধার করে বসবাস শুরু করেছেন টোটোরা।
ভক্ত জানিয়েছেন, গত ২০১৭ সালে শুরু হয়েছিল প্রথম জমি পুনরুদ্ধার। সেই সময় টোটোদের একজন কুয়াপানিতে কিছুটা জায়গা নিয়ে ঘর বাঁধেন, চাষ শুরু করেন। ২০২২ সালের সমীক্ষার পর টোটোরা জানতে পারেন এই জমি বন দপ্তরের নয়, বরং খাসজমি। এরপর থেকেই টোটোরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের জমি পুনরুদ্ধার করে সেখানে আবার বসতি স্থাপন করা শুরু করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৭০টি টোটো পরিবার ঘর বেঁধে এখানে বসবাস করছেন। সেইসঙ্গে তাঁরা জমিতে ধান, ভুট্টা, মারুয়া চাষ করছেন। এছাড়াও গরু, ছাগল, শুয়োর ও মুরগি পালন করে বিকল্প রোজগারের পথ তৈরি করছেন।
ভক্ত বলেছেন, ‘টোটোদের আর্থসামাজিক অবস্থার চরম অবনতি শুরু হয়েছে। নিজেদের জমি থাকলেও টোটোদের প্রায় কারও জমির পাট্টা নেই। তবে, নতুন গ্রাম টোটোদের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন আনবে। কারণ এখানকার মাটি চাষবাসের উপযোগী।’
২০২২ সালের সমীক্ষার পর এই গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। পানীয় জলের তীব্র সংকট রয়েছে। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে তিনটি পানীয় জলের টিউবওয়েল তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। টোটোপাড়ায় প্রবেশের আগে হাউড়ি নদী পেরিয়ে পূর্বদিকে দুই কিলোমিটার এগোলেই এই গ্রাম। যোগাযোগের জন্য রাস্তা এখনও তৈরি হয়নি। হাউড়ির ওপর সেতু না থাকায় নদী দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। তাই ভরা বর্ষায় হাউড়ি ফুঁসে উঠলে বন্দি থাকেন তাঁরা।
গ্রামের বাসিন্দা দিলরঞ্জন টোটোর বয়স এখন প্রায় ৬৩ বছর। তিনি জানালেন, এই কুয়াপানিতে একসময় তাঁদের পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল। তাঁর বাবা হরনা টোটোর কাছে শুনেছেন, এখন থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে হঠাৎই একদিন বনকর্মীরা হাতির পিঠে চেপে এসে হানা দেয় টোটোদের গ্রামে। বাবা ও ঠাকুরদার ভিটে জ্বালিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয় সেই জমি থেকে। এরপর বহু বছর সেখানে বন দপ্তরের ভয়ে কেউ যেতেন না। তবে বাবার কাছে তিনি জানতে পেরেছিলেন, ওই জমি তাঁদেরই।
দিলরঞ্জন বলেন, ‘২০১৬ সালে জঙ্গলের কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করেছিলাম। ২০১৭ সালে প্রথম এখানে ঘর তৈরি করি। এরপর ২০১৮ সালে আসেন বিল্টু টোটো, চেকরাশিং টোটো, ধুরে টোটো, পুরুষ টোটো। ২০২২ সালে টোটোপাড়ার জমির সমীক্ষা করা হয়। সেই সময় আমরা জানতে পারি এটা খাসজমি। এরপর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭০টি টোটো পরিবার একে একে ঘর তৈরি করেছে এখানে। তবে যেহেতু জমির মালিকানার কাগজপত্র কেউ এখনও হাতে পায়নি সেজন্য পাকা ঘরবাড়ি তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার গ্রামে গিয়ে দেখা গেল জমিতে আলু লাগিয়েছেন গুসরে টোটো। বললেন, ‘জমিতে ধান, আলু, ভুট্টা দুর্দান্ত হচ্ছে। তবে ভয়ে আছে হাতির।’ মূলত হাতির ভয়েই ছোট ছোট টংঘর তৈরি করে টোটোরা রয়েছেন। একটি ঘর থেকে আর একটি ঘরের দূরত্ব ৩০০ মিটার থেকে ৫০০ মিটার। অনেকেই বললেন, ‘জমির কাগজপত্র এখনও হাতে পাইনি। পেলেই ভালো করে ঘর করব।’
টোটো ভাষায় নুবি শব্দের মানে নীচু এলাকা। প্রায় নদীর চর হওয়ায় টোটোরা ঠিক করেছেন তাঁদের গ্রামের নাম হবে নুবিগ্রাম। পূর্বপুরুষের ভিটে নুবিগ্রাম ঘিরেই এখন তাঁদের যাবতীয় স্বপ্ন।
