জয়গাঁ: একের পর এক রোস্তোরাঁ এবং কংক্রিটের বাসস্থান। জয়গাঁর তোর্ষার (Torsa River) চর আটকে একের পর এক নির্মাণকাজ চলেছেই। জয়গাঁর (Jaigaon) দুটি এলাকায় তোর্ষা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ আটকানো হচ্ছে কয়েক দশক ধরে। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তোর্ষা পাহাড়ি নদী, ভুটান পাহাড় থেকে তার সৃষ্টি। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে ফুঁসে ওঠে তোর্ষার জল। পাহাড়ি চঞ্চলা নদী তখন রূপ নেয় রুদ্রাণীর। এখনও সতর্ক না হলে আগামীতে ভয়াবহ বিপদ অনিবার্য।
তোর্ষা নদীর রুদ্ররূপ জানেন জয়গাঁর বাসিন্দারা। তাঁরা ভালো করেই জানেন, তিন-চারদিন ভুটান পাহাড়ে টানা বৃষ্টি হলেই তোর্ষা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কোনওদিন তোর্ষা রুদ্রমূর্তি ধরলে জয়গাঁর প্রায় অর্ধেকই ভেসে যাবে। এত কিছু জানার পরেও উদাসীন জয়গাঁর মানুষ, বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের একাংশ। তোর্ষা নদীর পাড় তাঁদের কাছে বিনোদনের পণ্য হয়ে উঠেছে। জয়গাঁর বড় মেচিয়াবস্তি এখন শুধু জয়গাঁ নয়, দূরদূরান্তের বাসিন্দাদের আমোদপ্রমোদের স্থান। শনিবার বা রবিবার, অথবা কোনও ছুটির দিনে বড় মেচিয়াবস্তির রিসর্টগুলিতে ভিড় উপচে পড়ে। ভুটান পাহাড় আর নদীর অতুল সৌন্দর্যের টানে পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে এখানে গত দু’বছরে গজিয়ে উঠছে একের পর এক রেস্তোরাঁ। তিন বছর আগেও এই এলাকায় ছিল দুটি রেস্তোরাঁ। এখন এই এলাকা জয়গাঁর আমজনতার কাছে ‘রেস্তোরাঁ পাড়া’।
নদীপাড়ের জমির দামও আকাশছোঁয়া। একসময় যাঁরা নদীর ধারে চর এলাকা দখল করে ধান চাষ করতেন, তাঁরাই এখন কেউ রেস্তোরাঁ করেছেন, কেউ বা সাদা কাগজে লেখাপড়া করে জমি বিক্রি করেছেন। তাঁদেরই একজন জানালেন, ধানি জমি থাকার সময় বড়জোর ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা কাঠা দর পাওয়া যেত। এখন চরের জমি অনায়াসে ৮ লক্ষ টাকা কাঠা দর ওঠে। তাতেও জায়গা পাওয়া যায় না।
বড় মেচিয়াবস্তির একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁর প্রায় সামনে চলে এসেছে তোর্ষা। রেস্তোরাঁ থেকে নদীর দূরত্ব মেরেকেটে ৩০ মিটার। রেস্তোরাঁর এক কর্মী বললেন, ‘গত রবিবার তোর্ষা যেভাবে বইছিল দেখেই আতঙ্ক হচ্ছিল। আমি তো ভাবলাম রেস্তোরাঁ আর থাকবেই না। নদীর চেহারা দেখে সেদিন আমি আর দুই সহকর্মী জামাকাপড় গুছিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম।’ এই রেস্তোরাঁ থেকে ২০ মিটার দূরে নতুন আরেকটি রেস্তোরাঁ তৈরি হয়েছে। বিশেষ দিনে উঠতি বয়সিদের ভিড় থাকে। রেস্তোরাঁর মালকিন পূজা ভুজেল বলেন, ‘অত ভেবে তো আর রেস্তোরাঁ তৈরি করিনি। পর্যটকরা আসেন, ভালো আয় হয়। মনে হয় না তোর্ষা ক্ষতি করবে রেস্তোরাঁর।’
বড় মেচিয়াবস্তি থেকে ছোট মেচিয়াবস্তির দূরত্ব ৩০০ মিটার। ছোট মেচিয়াবস্তির পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে তোর্ষা। দু’বছর আগে তোর্ষা একবার ফুঁসে ওঠায় ১৫টিরও বেশি বাড়ি ভেঙে যায়। একটি আইসিডিএস কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখনও এলাকায় গেলে দেখা যায়, আইসিডিএস-এর সহায়িকা স্থানীয় কারও বাড়ির উঠোনে শিশুদের পড়াচ্ছেন।
তোর্ষা নদীর জল বাড়লেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এলাকাবাসী। প্রশ্ন ওঠে, তাঁরা কেন এই এলাকায় ঘর তৈরি করে আছেন? কারা তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে? আমিনা বিবি নামে তোর্ষাপাড়ের এক বাসিন্দা বলেন, ‘২০ বছর ধরে তো এখানেই আছি। আগে তো তোর্ষা দূরে ছিল। আমরা কি জানতাম নাকি তোর্ষা ঘরের সামনে চলে আসবে। এসবের জন্য ভুটান দায়ী।’ এলাকাবাসীদের কথায়, শহরে জায়গা ছিল না দেখে তাঁরা এই এলাকায় চলে এসেছিলেন থাকতে। কেউ ২০, আবার কেউ ৪০ বছর ধরে এখানে আছেন। সুভাষ বিশ্বকর্মা নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা অত বুঝি না। নদী কখন কী হবে জানি না। যখন ঘর বানাচ্ছিলাম তখন কেউ তো বাধা দেয়নি। এখনও তো কেউ উঠে যেতে বলছেন না।’
জয়গাঁর পূর্বদিক দিয়ে বয়ে চলা গোবরজ্যোতি নদী জলে ভরে ওঠে টানা বৃষ্টি হলে। এখানে দেখা যায় আলাদা সমস্যা। নদীর জলের সঙ্গে পলি-বালি এতটা পরিমাণে চলে আসে যে, জল সরার পরেও ঘরবাড়িতে আস্তরণ পড়ে যায়। এলাকায় দেখা গেল, পলি-বালি দিয়ে এখনও ঢেকে রয়েছে কিছু ঘর। সেখানকার বাসিন্দারা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
তোর্ষার চর দখল প্রসঙ্গে জেডিএ চেয়ারম্যান গঙ্গাপ্রসাদ শর্মা বলছেন, ‘বছরের পর বছর ধরে আমরা তো এই এলাকায় আছি। কত জনের বৈধ কাগজ আছে, আমার তো জানা নেই। রাজ্য সরকার তো তাও চা বাগান এলাকায় জমির পাট্টা দিচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার তো কিছুই করেনি।’
রাজনৈতিক চাপানউতোর যাই থাকুক না কেন, মানুষের আগ্রাসনে দমবন্ধ হয়ে আসছে তোর্ষার, একথা সবাই বুঝছেন। কখনও বাসস্থান, কখনও ব্যবসার নামে এই অত্যাচার তোর্ষা কতদিন সহ্য করবে, তা কেউ জানে না। তবে, জলঢাকার মতো একদিন তোর্ষা প্রত্যাঘাত করলে জয়গাঁ যে শ্মশান হয়ে যাবে, তা বুঝেও চোখ বন্ধ করে রয়েছেন পাড়ের বাসিন্দারা থেকে প্রশাসন।
