বর্ধমান: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তৃণমূলের ভরাডুবির পর থেকেই জেলায় জেলায় শাসকদলের একাধিক প্রাক্তন নেতা-নেত্রীদের দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হতে শুরু করেছে (TMC Corruption Arrest)। এবার এক বিপুল আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠল পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া। করুই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ভুয়ো জব কার্ড তৈরি করে ১০০ দিনের কাজের টাকা আত্মসাৎ এবং ব্রাহ্মণী নদী সংস্কারের টাকা লুঠের অভিযোগে কাটোয়া থানার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেন তৃণমূলের দুই দাপুটে নেতা। ধৃতেরা হলেন কাটোয়া ১ ব্লক এলাকার তৃণমূলের দুই সাধারণ সম্পাদক দিগন্ত পাল ও বিশ্বনাথ সাহা। এই দুজনকে রবিবার কাটোয়া মহকুমা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক ৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাটোয়ার রাজনৈতিক মহলে তুমুল শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
কাটোয়া ১ ব্লকের করুই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা কুতুব উদ্দিন শেখ, স্বপন দত্ত, আতর আলী শেখদের অভিযোগ, ২০১৬ সাল থেকে এলাকায় একচ্ছত্র দাপট দেখিয়ে সাধারণ মানুষের অজান্তে তাঁদের নামে ভুয়ো জব কার্ড ও স্থানীয় গ্রামীণ ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। সেখানে ১০০ দিনের কাজের টাকা ঢুকিয়ে তা তড়িঘড়ি তুলে নিত তৃণমূলের এই প্রভাবশালী নেতারা।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে করুই এলাকার উপর দিয়ে বয়ে চলা ব্রাহ্মণী নদীর সংস্কারের কাজ নিয়ে। গ্রামবাসীদের দাবি, নদী সংস্কারের নামে প্রায় ৪০০-র বেশি জব কার্ড হোল্ডারের অ্যাকাউন্টে ১৮ হাজার টাকা করে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু টাকা ঢোকামাত্রই সেই টাকার মধ্য থেকে ১৫ হাজার টাকা করে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য করা হতো। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই জুটত বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও খুনের হুমকি। এমনকি বাড়ির মহিলাদেরও শারীরিক হেনস্থা করা হতো বলে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন প্রতারিত গ্রামবাসীরা।
গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি, তৎকালীন দাপুটে তৃণমূল জেলা সভাপতি তথা কাটোয়ার প্রাক্তন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের অঙ্গুলি হেলনেই এই কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও ত্রাসের রাজত্ব চলত। আগে পঞ্চায়েত বা থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে উল্টে মার খেতে হতো। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতেই ভয়ের চাদর সরিয়ে গ্রামবাসীরা একজোট হয়ে প্রথমে পঞ্চায়েত এবং পরে কাটোয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। আর তাতেই নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন।
এই প্রসঙ্গে করুই গ্রাম পঞ্চায়েতের সেক্রেটারি গৌর দাস মুখোপাধ্যায় বলেন, “আগে আইনের শাসন ছিল না, ছিল শাসকের আইন। এখন রাজ্যে প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। গ্রামবাসীরা যে অভিযোগ জানিয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে।” অন্যদিকে কাটোয়ার নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণ ঘোষ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “করুইয়ের মানুষ এই মেগা দুর্নীতির পর্দা ফাঁস করেছেন। এই কাণ্ডে জড়িত কাটোয়ার বড় মেজো মেজাজ দেখানো কোনও নেতাই পার পাবেন না। সকলের ঠাঁই হবে গারদে।”
রবিবার দুপুরে ধৃত দুই তৃণমূল নেতা দিগন্ত পাল ও বিশ্বনাথ সাহাকে নিয়ে পুলিশ কাটোয়া মহকুমা আদালত চত্বরে পৌঁছাতেই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। উপস্থিত শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষ তাঁদের দেখে ‘চোর-চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। সেই সময় আদালত চত্বরে ধৃত নেতাদের কিছু অনুগামীকে জমায়েত করতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের লক্ষ্য করে একের পর এক ডিম ছোড়া হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তৃণমূল অনুগামীরা পালাতে গেলে ক্ষুব্ধ জনতা তাঁদের ধাওয়া করে ধরে ফেলে এবং রাস্তাতেই ব্যাপক গণধোলাই দেওয়া শুরু করে। আদালত চত্বরে এমন ধুন্ধুমার কাণ্ড সামাল দিতে পুলিশকে রীতিমতো লাঠি উঁচিয়ে কড়া পদক্ষেপ নিতে হয়।
এদিকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে কাটোয়ার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছন, “রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হতেই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত এবং চক্রান্ত করে আমাদের দলের নেতাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।” ঘটনার তদন্ত জারি রেখেছে পুলিশ।
