অরুণ ঝা, ইসলামপুর: তৃণমূল (TMC) জমানায় চারপাশে নীল-সাদার মধ্যে বহুদিন নিজের লাল দুর্গ রক্ষা করেছিলেন। এখন তাঁর ঘাড়ে উত্তরের মাটিতে আবার ‘হাত’ ধরার লোক জোটানোর ভার। তিনি আলি ইমরান রমজ। কিন্তু ভিক্টর নামে তাঁকে সারা বাংলা চেনে। দিল্লির রাজনৈতিক মহলেও এই নামে পরিচিতি। কংগ্রেসের এখন তিনি উত্তরবঙ্গে অন্ধের যষ্টি যেন। তৃণমূল ভাঙিয়ে কংগ্রেসকে শক্তিশালী করতে ভিক্টর যেন আদা-জল খেয়ে নেমেছেন উত্তরবঙ্গে।
সম্প্রতি মৌসম নুর তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসের হাত ধরেছেন। সেদিনই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বুঝিয়েছিলেন, মৌসমের ঘরে ফেরা আসল সিনেমার ট্রেলার মাত্র। তা যে কথার কথা নয়, ভিক্টরের কথায় তা স্পষ্ট। আদতে গোয়ালপোখরের ভূমিপুত্রের ভাষায়, ‘দলের স্বার্থে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে যা করার করছি। এর বেশি বলা সম্ভব নয়। তবে হ্যাঁ, তৃণমূলের দুজন সাংসদ ও ১৪ জন বিধায়কের সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর গড়িয়েছে।’
উত্তরবঙ্গেই যদি দুই সাংসদ ও ১৪ বিধায়ক তৃণমূল থেকে মুখ ফেরান, কংগ্রেসের এমন আকালের বাজারে সেটা বড় খবর নিশ্চয়ই। এই জনপ্রতিনিধিরা অতীতে কংগ্রেস ছেড়ে ঘাসফুলে নাম লিখিয়েছিলেন। ভিক্টরের এই তৎপরতা কিন্তু শুধু প্রদেশ নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে নয়, কংগ্রেস হাইকমান্ড ভরসা রাখছে তাঁর ওপর। খোদ রাহুল গান্ধির স্নেহচ্ছায়ায় আছেন অতীতের এই ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা।
কথায় কথায় ভিক্টর বলেন, ‘রাহুল গান্ধি নির্দেশ দিয়েছেন, বাংলায় দলকে মজবুত করতে যা করতে হয় করুন। তাতে কে চটে গেল, তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না।’ আলাপচারিতায় বোঝা গেল, কংগ্রেসের গেমপ্ল্যান এখন পুরোনো ঘাঁটিগুলির পুনরুদ্ধার। মালদা, উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ তাই কংগ্রেসের পাখির চোখ এখন। এই জেলাগুলি বাম আমল তো বটেই, তৃণমূল জমানাতেও দীর্ঘদিন হাত প্রতীককে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলাও নজরে আছে কংগ্রেসের। এইসব জেলায় শাসকদলের নেতাদের অনেকের সঙ্গে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার গোপন বৈঠক করেছেন ভিক্টররা। শাসকদলের নেতারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভোটে কী সমীকরণ তৈরি হয়, তা মাথায় রেখে জল মাপছেন।
তৃণমূল প্রকাশ্যে এসব পাত্তা দিতে চাইছে না বটে। তবে মৌসমের দলবদল তৃণমূলে যে কাঁপন ধরিয়েছে, তা স্পষ্ট। তৃণমূলের উত্তর দিনাজপুর জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়ালের মন্তব্য, ‘এসব ভিক্টরের কল্পনামাত্র। তৃণমূল ছেড়ে কেউ কোথাও যাবেন না।’ দলের রাজ্য কমিটির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক অসীম ঘোষ বলেন, ‘ভিক্টর মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। মৌসমকে দিয়ে বিচার করলে হবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন ও সুশাসন ছেড়ে কেউ কোথাও যাবেন না।’
তাঁর দাবি, ‘বাংলার কোনও নেতা, সাংসদ ও বিধায়ক তৃণমূল ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আগামী বিধানসভা ভোটে গতবারের তুলনায় অনেক বেশি আসন নিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসবে।’ বাস্তবে ভিক্টর রাহুলের যে নির্দেশের কথা বলেছেন, তাতে আগামী বিধানসভা ভোটে তৃণমূলকে চাপে রাখতে কংগ্রেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কৌশল আছে বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও ভিক্টর বলছেন, ‘জোট নিয়ে আপাতত শীর্ষ নেতৃত্ব আমাদের কোনও নির্দেশ দেয়নি। সমস্ত আসনেই আমরা শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে ঝাঁপ দিয়েছি।’ মাসদুয়েক আগে দিল্লিতে রাজ্যের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তৃণমূল ভাঙানোর এই ফরমান খোদ রাহুল জারি করেন। সেই খেলায় শুধু দুই সাংসদ ও ১৪ বিধায়ক নয়, ঘাসফুল শিবিরের জেলা ও ব্লক স্তরের অনেক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন ভিক্টর।
বিক্ষুব্ধ ও সংখ্যালঘু কার্ড এই খেলার অন্যতম হাতিয়ার। উত্তরের উল্লিখিত জেলাগুলিতে তৃণমূলে অনেক সংখ্যালঘু নেতা ও জনপ্রতিনিধি আছেন। ভিক্টরের নিজের জেলা উত্তর দিনাজপুরের বিধায়কদের দুই-একজন তলে তলে কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন। বিধানসভা ভোটে তৃণমূল টিকিট না দিলে তাঁদের জন্য কংগ্রেসের দরজা খোলা বলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ওই বিধায়কদের বড় অংশই আগে কংগ্রেসে ছিলেন। ভিক্টরের স্ট্র্যাটেজি এখন ‘শাসকদলে মূল্য না পেলে কংগ্রেসে আসুন।’ ‘ব্রেনওয়াশের’ কারিগর অতীতের দক্ষ বাম সংগঠক ভিক্টরই।
