শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: ‘আপনার যা বাজেট তাতে ওই ডান দিকের প্লটটা হয়ে যাবে।’ আঙুল তুলে হাতিঘিসার রাস্তার পাশে কংক্রিটের পিলার বসানো জমির দিকে তাকিয়ে বলছিলেন বছর চল্লিশের এক ব্যক্তি। ক্রেতা মণিপুরের বাসিন্দার মুখে তখন চওড়া হাসি। মিনিট দশেক আলোচনার পর দুজনেই এসে বসলেন রাস্তার পাশের একটি চায়ের দোকানে। ‘পরে কোনও সমস্যা হবে না তো?’ মণিপুরের বাসিন্দা ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করতেই মুচকি হাসলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি। খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন, ‘এখানে সব সেটিং করা আছে। এমনি এমনি এত লোককে এনে বসাইনি।’ চা খেয়ে মিনিট পনেরো পর দুজনে দোকান ছাড়তেই দোকানি এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘দেখলেন তো কীভাবে সরকারি জমি বিক্রি করে দিচ্ছে। সব নেতাদের মদতে হচ্ছে। মণিপুর থেকে লোক ধরে আনছে আর বসিয়ে দিচ্ছে।’ আধ ঘণ্টার ওই গল্পটাই নকশালবাড়ি এলাকার পরিস্থিতি ও সাধারণ ভোটারদের না বলা অনেক কথাই বলে দেয়।
তরাইয়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বালাসনের জলস্রোত যতখানি স্বচ্ছ, দার্জিলিং জেলার মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের (Matigara-Naxalbari) রাজনৈতিক চোরাবালির সমীকরণ ঠিক ততখানিই ঘোলাটে। একসময়ের অগ্নিগর্ভ নকশাল আন্দোলনের আঁতুড়, যেখানে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ শোনা গিয়েছিল, সেখানে রাজনীতির রং বদলেছে বহুবার। বামেদের লাল দুর্গ ধসে গিয়ে সেখানে কখনও হাত শিবির থাবা বসিয়েছে, আবার কখনও পদ্ম শিবিরের জয়পতাকা উড়েছে। কিন্তু আশ্চর্য এক সমীকরণ মেনে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) আজ পর্যন্ত এই মাটির দখল নিতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে আদর্শের চেয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের হুংকার আর জনবিন্যাসের জটিল পাটিগণিত অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
নকশালবাড়ির আকাশে লাল পতাকার আধিপত্য আজ অতীত হলেও তা একেবারে মুছে যায়নি। চা বাগানের স্যাঁতসেঁতে গলি থেকে শুরু করে শিক্ষিত সমাজের ড্রয়িংরুম- সিপিএমের তাত্ত্বিক আধিপত্য আজও কিছু মানুষের হৃদস্পন্দনে টিকে আছে। কিন্তু সমকালীন রাজনীতির পরিহাস হল, এই বাম ভোটই এখন বিজেপির জয়ের সোপান হয়ে উঠছে। তৃণমূলকে রোখাই যাঁদের মূল লক্ষ্য, সেই বাম ভোটারদের একটি বড় অংশ শেষমুহূর্তে পদ্ম চিহ্নে ছাপ দিয়ে দিচ্ছেন। এই ট্রেন্ড গত নির্বাচনেও বর্তমান বিধায়ক আনন্দময় বর্মনের জয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল। বিজেপিও চতুরতার সঙ্গে এই বাম বিমুখতাকে নিজেদের ঝুলিতে ভরতে সক্রিয়। অন্যদিকে, কংগ্রেসের জমি এখন তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে লীনপ্রায়। তবু কিছু পুরোনো অনুগত ভোটার আজও প্রতীকের টানে ঘাসফুল বা পদ্ম ফুলের জোয়ারে গা ভাসাননি, যা নির্বাচনি ফলাফলে শুধুমাত্র মার্জিনে তফাত গড়ে দিতে পারে, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তাকালে দেখা যায় এক জতুগৃহের ছবি। সাংগঠনিকভাবে এই বিধানসভায় দলটি অত্যন্ত নড়বড়ে, যেখানে সেনাপতির চেয়ে সৈন্যদলের আত্মকলহ বেশি প্রকট। প্রাক্তন কংগ্রেস বিধায়ক শংকর মালাকারের জার্সি বদল করে তৃণমূলে আগমন দলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর প্রার্থীপদ নিয়ে আদি ও নবীনদের লড়াই এখন প্রকাশ্য দিবালোকে। শংকর মালাকার যদি শেষপর্যন্ত টিকিট পান, তবে ক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মীদের একাংশ যে তলে তলে কংগ্রেস প্রার্থীকে মদত দেবে, তার সম্ভাবনা প্রবল। পাহাড়ের কোল ঘেঁষা এই জনপদে তৃণমূল এখন বহু খণ্ডে বিভক্ত এক দ্বীপের মতো। চম্পাসারি থেকে আঠারোখাই, মাটিগাড়া থেকে বাগডোগরা- প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বিষবাষ্প উড়ছে। জনক সাহা বনাম বাদল দাস, প্রিয়াংকা বিশ্বাস বনাম দীপালি ঘোষ, কিংবা দুর্লভ চক্রবর্তী বনাম অভিজিৎ পালের বিবাদ দলটিকে ভেতর থেকে খোকলা করে দিয়েছে। সবাই এখানে নেতা হতে চান, কিন্তু আদর্শের মিছিলে কর্মী হওয়ার দায় কারও নেই। বিশেষ করে নকশালবাড়ি এলাকায় অরুণ ঘোষের একাধিপত্য নিয়ে দলেরই একাংশের বিরক্তি চরমে পৌঁছেছে। পাপিয়া ঘোষ বা আনন্দ ঘোষের সঙ্গে তাঁর ঠান্ডা লড়াই ভোটের ময়দানে শাসক শিবিরের কফিনে শেষ পেরেক পুঁততে পারে।
এই ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন খগেশ্বর রায়ের মতো নেতারা। তৃণমূলের একসময়ের ব্লক সভাপতি খগেশ্বর এখন গেরুয়া শিবিরে, যাঁর লক্ষ্য শুধুই প্রতিশোধ। রাজবংশী ভোটের একটি অংশ তাঁর পকেটে থাকায় তৃণমূলের কপালে ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক। অন্যদিকে, শিলিগুড়ি পুরনিগমের কাউন্সিলার দিলীপ বর্মনও তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে টিকিট পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই বিধানসভাটি তপশিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত হওয়ায় রাজবংশী ভোটের নিয়ন্ত্রণ যে নেতার হাতে থাকবে, তিনিই হবেন তরাইয়ের শেষ কথা। কিন্তু তৃণমূলের প্রভাবশালী রাজবংশী নেতারা এখন হয় ঘরে বসে আছেন, নয়তো তলে তলে অন্য চাল চালছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমি মাফিয়া আর বালি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে তৃণমূল এখন শুধুই ‘টাকা রোজগারের যন্ত্র’ হিসেবে পর্যবসিত হয়েছে, যা সুস্থ ও শিক্ষিত সমাজের মনন থেকে দলটিকে ক্রমশ দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
বিজেপির কাছে মাঠ অনেকটাই ফাঁকা থাকলেও সেখানেও শান্তিজল নেই। বর্তমান বিধায়ক আনন্দময় বর্মন ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে পরিচিত হলেও বড় কোনও উন্নয়নের ছাপ তিনি ফেলতে পারেননি। আরএসএস-এর নিভৃত প্রচার আর জনবিন্যাসের পাটিগণিত (রাজবংশী, নেপালি, আদিবাসী এবং হিন্দিভাষী ভোট) বিজেপির মূল শক্তি। কিন্তু বিজেপির অন্দরেও অরুণ মণ্ডল বনাম আনন্দময় বর্মনের লড়াই চোরা স্রোতের মতো বইছে। এই কেন্দ্রে অরুণ মণ্ডল প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। দুই নেতার লড়াই গেরুয়া শিবিরের সংহতিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সব দিকের বিচারে মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি বিধানসভার ভোটের অঙ্ক মেলানো খুব একটা কঠিন নয়। একদিকে দুর্নীতির কলঙ্ক আর নজিরবিহীন গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ তৃণমূল, অন্যদিকে সাংগঠনিক ফাটল সামলে বাম-কংগ্রেসের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে জয়ের স্বপ্ন দেখা বিজেপি। রাজবংশী আবেগ আর সিন্ডিকেটরাজের লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, তা সময়েই স্পষ্ট হবে। তবে আপাতত যা পরিস্থিতি তাতে দু’কদম এগিয়েই পা ফেলছে গেরুয়া শিবির।
বুধবার সন্ধ্যায় শিবমন্দিরের সাবিত্রী মোড়ে দাঁড়িয়ে চা চুমুক দিতে দিতে কথা হচ্ছিল স্থানীয় এক তৃণমূল নেতার সঙ্গে। হঠাৎ সেখানে বাইক নিয়ে এসে দাঁড়ালেন দলেরই আর এক নেতা। হাসতে হাসতে বললেন, ‘এবার আমাদের স্লোগান একটাই, ভোট দেও বাটুক, কোটে ফাটে ফাটুক।’ দিনের শেষে সেটাই হয়তো গড়পড়তা তৃণমূল সমর্থকের কথা। চা শেষ করে ফেরার সময় নেতার অনুরোধ, ‘এইসব আবার আমাদের নাম দিয়ে লিখে দিও না। তাহলে কেস খেতে হবে।’
