রণজিৎ ঘোষ, তিস্তাবাজার: প্রকৃতির ধ্বংসলীলার ক্ষতচিহ্ন আছে, রয়েছে বঞ্চনার অভিযোগও। কিন্তু এসব কিছুই যেন ম্লান হয়ে গিয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর সদিচ্ছার কাছে।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সর্পিল পিচ রাস্তাটি যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেখান থেকে নীচের দিকে তাকালে এখন আর চেনা তিস্তাকে খুঁজে পাওয়া ভার। একপাশে খাড়া পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা জনবসতি, যার আনাচে-কানাচে আজও উঁকি দেয় ভাঙা দেওয়াল আর উপড়ে যাওয়া কংক্রিটের কঙ্কাল। অন্যপাশে, যেখানে একসময় নদীর গভীরতা ছিল, সেখানে এখন শুধুই পলি আর বালি দিগন্তবিস্তৃত (Teesta Sandbanks)। ওপর থেকে দেখলে মনে হয়, চারদিক ঘেরা সবুজ পাহাড়ের মাঝে কেউ যেন এক পোঁচ ধূসররঙা তুলি বুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির এই রুক্ষ, বিবর্ণ ক্যানভাসের ঠিক মাঝখানেই এক টুকরো বিস্ময়। ধু-ধু বালুচরের বুকে সযত্নে তৈরি করা হয়েছে ক্রিকেটের ‘মাঠ’ (Cricket floor)।
চারধারে সবুজ নেটের বাউন্ডারি, মাঝখানে পিচ আর একপাশে খেলোয়াড়দের জিরিয়ে নেওয়ার জন্য তৈরি ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া ঘর। পাশ দিয়ে বয়ে চলা তিস্তার শীর্ণ নীল জলধারা আর পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা ধ্বংসের ক্ষতের মাঝখানে এই মাঠটি যেন এক বার্তা… সব শেষ হয়েও আসলে কিছুই শেষ হয় না।
২০২৩ সালের ভয়াবহ হড়পায় তিস্তাবাজার ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। সেখানেই আশার আলো দেখাচ্ছেন স্থানীয় কিছু কিশোর আর তরুণ। হড়পার কারণে যে পলি জমেছিল চরে, গিলেছিল ঘরবাড়ি, সেই পলির কিছুটা অংশ সরিয়ে নদীর চরকে সমান করে মাঠটি বানিয়েছেন ওঁরা। কথা হচ্ছিল অমিত মোখতানের সঙ্গে। বললেন, ‘অনেক ঘরবাড়িই ভেসে গিয়েছে। কোনওদিন হয়তো আবারও হড়পা আসবে। তিস্তায় এমন জল বাড়বে যে, আমরাও ভেসে যাব। তাই যতদিন বেঁচে আছি, একটু আনন্দ করে বাঁচতে চাই।’
সিকিমে লোনাক লেক বিস্ফোরণের জেরে তিস্তায় বিশাল জলস্ফীতি দেখা দিয়েছিল। তাতে সিকিমের যেমন ক্ষতি হয়েছে, একইভাবে কালিম্পং জেলার তিস্তাবাজার, ত্রিবেণিতেও প্রচুর ঘরবাড়ি ভেসে গিয়েছে। জলের তোড়ে ভেসে আসা পলি জমতে জমতে চর ও তার আশপাশে ১৫-২০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র তিস্তাবাজারেই শতাধিক বাড়ি, দোকান, গ্যারাজ নদীগর্ভে চলে যায়। আড়াই বছর পরেও পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে পারেনি প্রশাসন।
সেই জায়গায় জীবনের সুর যে এত সুন্দরভাবে বেজে উঠতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের ওপর এখন আর শুধু হাহাকার নেই, আছে ব্যাট-বলের ঠুকঠাক শব্দ। বোলার যখন দৌড়ে আসছেন, তখন তাঁর পায়ের নীচে সেই বালি, যা একদিন আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। ব্যাটার যখন সজোরে ড্রাইভ মারছেন, বলটি সীমানা ছাড়াচ্ছে সেই ধ্বংসস্তূপকে সাক্ষী রেখেই। দর্শকদের হাততালি আর উল্লাসধ্বনি ছাপিয়ে যাচ্ছে নদীর গর্জনকে।
অমৃত ইয়নজন তাঁদেরই একজন। অমৃতর কথায়, ‘প্রায় দু’মাস হল আমরা এই মাঠ তৈরি করেছি। এখানে অনেকটা উঁচু পলি, বালির স্তর জমেছিল। আমরা প্রায় ২৫ জন মিলে এক মাস ধরে সেই স্তর সরিয়ে জায়গাটিকে সমান করেছি। তারপর খেলার উপযুক্ত মাঠ বানিয়েছি। একটা টুর্নামেন্টও হয়েছে।’
কিন্তু এই মাঠের পাশেই তো তিস্তা বইছে। জোরে ব্যাট চালালে বল নদীতে পড়ার সম্ভাবনা ভীষণরকম। এই কথা শুনে হেসে উঠলেন স্থানীয় সুমন বাগদাস। তাঁর যুক্তি, ‘আমরা সাবধানে খেলি। বল যেন ঘেরাও করা জায়গার বাইরে না যায়, সেজন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়। বল একবার নদীতে পড়ে গেলে কিছু করার নেই। ওটা ভেসে যায়।’
অদূরে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলে যাওয়া রাস্তা দিয়ে মাঝেমধ্যে গাড়ি চলে যাচ্ছে, যাত্রীরা অবাক হয়ে দেখছেন এই দৃশ্য। বিকেলের পড়ন্ত রোদে যখন এই মাঠে খেলা জমে ওঠে, তখন পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ হয় মাঠে। তিস্তার হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায় খেলোয়াড়দের ঘর্মাক্ত শরীর। আধভাঙা একটি ঘরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে প্রদীপ থাপা বলে উঠলেন, ‘ওটা আমাদের বাড়ি ছিল। তিনটা ঘরের একটা এখনও আছে। বাকি দুটো ঘর, শৌচালয় ভেসে গিয়েছে। সেই সময় থেকে আমরা ভাড়াবাড়িতে থাকি। বাবা দিনমজুর। আমি কোনও কাজকর্ম পাইনি। সারাদিন ঘরে বসে ভালো লাগে না, তাই এই মাঠটি তৈরি করেছি।’
এই মাঠ যেন এক রূপক- যেখানে প্রতিকূলতাকেই পিচ বানিয়ে ছক্কা হাঁকাচ্ছে জীবন। জীবন তো তিস্তার মতোই, সে বইবে আপন ছন্দে।
