জলপাইগুড়ি: চোখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে স্বপ্না বর্মন খেলার মাঠ ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। এর জন্য রেলের সাধের চাকরিটিও তাঁকে ছেড়েও দিতে হয়েছিল। তবে রাজনীতিকে কেন্দ্র করে মোহভঙ্গ হতেই তিনি ফের খেলার মাঠেই ফিরতে চাইছেন। ২০ জুন দিল্লিতে অ্যাথলেটিক ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে এই অনুষ্ঠানে স্বপ্নাকে (Swapna Barman) আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। স্বপ্না ইতিমধ্যে দিল্লিতে পৌঁছেও গিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে স্পেনে অনুষ্ঠিত হতে চলা ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুতি শুরু করতে চলেছেন। জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) এই ঘরের মেয়ে যে আবারও খেলায় ফিরছেন, তার ইঙ্গিত তিনি নিজেই দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে শরীরচর্চার কিছু ছবি পোস্ট করে স্বপ্না একপ্রকার রাজনৈতিক সন্ন্যাসের বার্তাই স্পষ্ট করেছেন।
স্বপ্নার মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যাথলিট কাউকে কিছু না জানিয়ে আচমকা রাজনীতিতে যোগ দেবেন, তা তাঁর গুণগ্রাহীরাও কখনও ভাবতে পারেননি। বিধানসভা ভোটের আগে কলকাতায় গিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর রাজগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিটে প্রার্থী হয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে বিজেপির প্রার্থীর কাছে ২১ হাজার ভোটে তাঁকে পরাজিত হতে হয়। এই ভোটে দাঁড়ানোর জন্য স্বপ্নাকে রেলের স্থায়ী চাকরিটি ছাড়তে হয়েছিল। বর্তমানে রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় নেই এবং দলের সাংগঠনিক অবস্থা টালমাটাল। নিজের বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্বপ্নার প্রতিক্রিয়া, ‘যে দলের জন্য নিজের চাকরি ছাড়লাম এখন সেই দলই আমার দিকে ঘুরে তাকায় না। কেনই রাজনীতিতে এলাম, কেনই বা রেলের চাকরি ছাড়লাম সেটাই এখন বাড়িতে বসে ভাবি।’
নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পাঠ নিতে গিয়ে স্বপ্না এবছর এশিয়ান গেমসের জন্য কোনও রকম প্রস্তুতি নিতে পারেননি। নিজের পুরো সময় তৃণমূলের (TMC) জন্য দেওয়ার পর বর্তমানে তিনি সপরিবারে গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সেই কারণেই হয়তো ইদানীং রাজনীতির প্রসঙ্গ জিজ্ঞেস করলেই তিনি তা সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। ইন্ডিয়ান অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে দিল্লিতে আয়োজিত ইন্ডিয়ান অ্যাথলেটিক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং তিনি তাতে শামিল হচ্ছেন বলে স্বপ্না জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া পেজে শরীরচর্চার ছবি পোস্ট করে স্বপ্না নিজের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার করেছেন। সেখানে স্বপ্না লিখেছেন, ‘ভোটে হেরেছি। পথটা কঠিন ছিল। কিন্তু ত্যাগও কম করিনি। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা এখনও হারাইনি। আজ সমালোচনা শুনছি, কাল হয়তো এই অভিজ্ঞতাই আমার শক্তি জোগাবে।
২০ জুন দিল্লির ওই অনুষ্ঠানে অ্যাথলেটিক্সে অসামান্য সাফল্যের জন্য তিনজন অ্যাথলিটকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার প্রদান করা হবে। সেই তিনজনের তালিকায় স্বপ্নাও আছেন কি না, তা অবশ্য তিনি নিজে স্পষ্ট করে জানাননি। তবে ক্রীড়ামহলের ধারণা, স্বপ্নাকে যদি লাইফটাইম পুরস্কারে কেন্দ্র সরকার সম্মানিত করে, তবে বুঝতে হবে বিজেপির হাত ধরেই তিনি আবারও খেলার জগতে ফিরছেন। কারণ তৃণমূল এখন স্বপ্নার কাছে সম্পূর্ণ অতীত হয়ে গিয়েছে। চাকরি হারিয়ে স্বপ্না বর্তমানে অত্যন্ত অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। পুনরায় খেলার জগতে ভালোভাবে ফিরে আসতে গেলে স্বপ্নার পক্ষে বিজেপি তথা কেন্দ্র সরকারের সহযোগিতার অত্যন্ত প্রয়োজন হবে। কারণ চাকরিহীন স্বপ্নার পক্ষে অনুশীলনের বিপুল আর্থিক খরচ একা বহন করা কোনওভাবেই সম্ভব নয়।
এর আগে ২০১৭ সালে এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের হেপ্টাথলনে স্বপ্না প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এরপর ২০১৮ সালে জাকার্তা এশিয়ান গেমসে হেপ্টাথলনেই সোনা জয় করেন। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যের পরই কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ অর্জুন পুরস্কারে সম্মানিত করে। ২০২০ সালে রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনে তাঁকে একটি স্থায়ী চাকরিও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই চাকরি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর এখন অনুতাপ করা ছাড়া স্বপ্নার কাছে আর কোনও রাস্তা নেই। দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর স্বপ্না শেষমেশ খেলার জগতে ফেরার সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তবে এত কম সময়ের মধ্যে নিজেকে এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার স্তরে প্রস্তুত করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। স্বপ্না নিজেও সেটা জানেন। শেষপর্যন্ত অবশ্য সমস্ত বাধাই কেটে যাবে বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস।

