Society, Rampant Corruption, and a Political Change

Society, Rampant Corruption, and a Political Change

জীবনযাপন/LIFE STYLE
Spread the love


স্কুলে-স্কুলে বিলি করার জন্য কর্পোরেট সংস্থার ঘাড় ধরে আদায় করা ল্যাপটপগুলিকে ফের দোকানে বিক্রি করে দেওয়া? আমফানের পর নিরন্ন, নিঃসম্বল মানুষের ঘর পুনর্নির্মাণের টাকাটুকু হাপিশ করে দেওয়া? ঘরের কাছে বদলি করে দেওয়ার টোপ দিয়ে লাখ-লাখ টাকা আদায় করা, বা চিটফান্ডের থেকে লাখ-লাখ টাকা মাইনে বা অনুদান নেওয়া অভিনেত্রী বা পরিচালকদের একবারও তদন্তকারী সংস্থার মুখোমুখি না হওয়া? লিখছেন বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

সেই মাস্টারমশাইয়ের কথা দিয়েই শুরু করতে হবে, যিনি ক্লাস নাইনের একটি ছাত্রকে পরীক্ষায় টুকলি করতে ধরে ফেলেছিলেন হাতেনাতে। আর এর ফল হয়েছিল সাংঘাতিক! ধরা পড়ে যাওয়া বাচ্চাটির খাতা কেড়ে নিতেই, সে মাস্টারমশাইকে বলে ওঠে: “যান না,
ক্ষমতা থাকলে ‘সারদা’-র চোরদের ধরুন। আমাকে ধরছেন কেন?” শুনে স্তম্ভিত মাস্টারমশাইয়ের সামনের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল কয়েক সেকেন্ডের জন্য;
সাদা বাংলায় যাকে বলে– ‘ব্ল্যাক আউট’। তারপর তিনি ‘নকল’ করতে গিয়ে ধরা পড়া ছাত্রটিকে তার খাতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন না কি দেননি, তা বড় কথা নয়, বরং জরুরি কথাটি হল: ক্লাস নাইনের ওই ছাত্রটি সরল একটি সত্যের সামনে নিয়ে গিয়ে যেন দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল মাস্টারমশাই-সহ সমাজের প্রত্যেককে। সেই সত্য এই যে, একটি নিরবচ্ছিন্ন ‘ব্ল্যাক আউট’-এর ভিতর দিয়েই পথ চলেছি আমরা রাজ্যবাসী বিগত দেড় দশক যাবৎ।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের
ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ‘ – এর পাতায়।

চোখ রাখুন

আরও পড়ুন:

এমন নয় যে, আগের আমলে কোনও দুর্নীতি হত না। মনে পড়ে বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দীর সেই উক্তি– ‘আপনি আর আমি দুর্নীতি করলে পরে সেটা দুর্নীতি বলে মনেই হবে না’– বাম আমলকে মাথায় রেখেই বলা। বামফ্রন্টের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর ছেলেকে জড়িয়ে বেঙ্গল ল্যাম্প ইত্যাদি দুর্নীতির কথা বাদ দিলেও, ’৭৭-’৯৭ অবধি প্রায় সব সরকার-পোষিত স্কুলে নিয়োগ হত লোকাল কমিটি এবং অনেক ক্ষেত্রে জেলা কমিটির মর্জিমাফিক। চাকরির চিঠি হাতে আসার আগে, পরিবারের ভোট কোন দলের প্রতীকে গিয়ে পড়ে, তার একটি নিবিড় তদন্ত চলত। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগও প্রায় সম্পূর্ণভাবে পার্টির নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, যে-প্রক্রিয়াকে ‘অনিলায়ন’ বলে অভিহিত করেছেন অনেক সাংবাদিকই। এমএসসিতে প্রথম হওয়া ছাত্রীর মেধাতালিকায় নামই ওঠেনি, কিন্তু অনেক পিছনে থাকা কারও বাবা দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা হওয়ার সুবাদে তার পোস্টিং হয়ে গিয়েছে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কোনও কলেজে, এমন উদাহরণ অজস্র।

আরও পড়ুন:

দুর্নীতির প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল: টাকা। বলা যেতেই পারে যে, বিগত দেড় দশকের ‘টেকটনিক শিফ্‌ট’ এটাই। এই শিফ্‌টের যে-যে বিষফল পাড়ায় পাড়ায় ফলতে দেখলাম আমরা, তা কীরকম?

‘ক’বাবু, ‘গ’বাবুর পুত্রবধূকে, দমদমের স্কুলের ইন্টারভিউতে চাকরি পাইয়ে দিলে– ‘গ’বাবু যে ‘ক’বাবুর জামাইকে বেহালার কলেজে পোস্টিং পাইয়ে দেবেন– এ ছিল সেই আমলের এক প্রচলিত রীতি। কান্তি বিশ্বাসের কাছে আমাদের এবং পরের দু’টি প্রজন্মও চিরঋণী থাকবে, কারণ তঁার মন্ত্রিত্বের সময়েই ‘স্কুল সার্ভিস কমিশন’ চালু হয়, যার ফলে পার্টির নিয়ন্ত্রণ থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসতে পারে স্কুলের চাকরি। কিন্তু তখনও, এবং পরেও শাসক দলের প্রভাবশালী কারও পুত্র-কন্যা বা নিকটাত্মীয় না হলে কিংবা গায়ে বাম ছাত্রনেতার তকমা না থাকলে পছন্দসই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়া দুষ্কর ছিল। দু’-চারটে ব্যতিক্রম সবসময়, সব জায়গাতেই থাকে। কিন্তু তারপরও কারা এবং কাদের ছেলেমেয়েরা টপাটপ অন্যদের টপকে বড় বড় জায়গায় নিয়োগ পেয়ে যেত, তা সকলেই জানত, ঘরোয়া আড্ডায় বলাবলিও করত।

কিন্তু ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর একটি বড় পরিবর্তন ঘটে গেল সমাজজীবনে। এমএ কিংবা এমএসসি বা নিদেনপক্ষে অনার্স গ্র্যাজুয়েট লোকাল কমিটির সেক্রেটারি, ডাক্তার অথবা উকিল কাউন্সিলরের বদলে মাথা চাড়া দিতে আরম্ভ করল এইট পাস ব্লক সভাপতি, সিক্স পাস কাউন্সিলরগণ। এবার সেই লোকগুলির পক্ষে তো সূক্ষ দুর্নীতি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া, তাদের সাতপুরুষে কেউ কখনও স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজেই যায়নি, তাই পাশের বাড়ির তন্দ্রাকে বঞ্চিত করে নিজের বাড়ির চন্দ্রাকে স্কুল শিক্ষয়িত্রী করে দেওয়ার মতলবও তাদের মাথায় আসেনি। মুসুর ডাল রোপণ করে জমির উর্বরতা ফিরিয়ে
দেওয়ার মতো ‘সিম্বায়োটিক রিলেশনশিপ’ অনেকাংশেই উবে গেল তাই, আর এর বদলে মারাত্মক একটি ব্যাপার ঘটল।

দুর্নীতির প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল: টাকা। বলা যেতেই পারে যে, বিগত দেড় দশকের ‘টেকটনিক শিফ্‌ট’ এটাই। এই শিফ্‌টের যে-যে বিষফল পাড়ায় পাড়ায় ফলতে দেখলাম আমরা, তা কীরকম? ঢাকুরিয়া লেক এবং যোধপুর পার্ক অঞ্চলের এক প্রবল পরিশ্রমী ফোর পাস কাউন্সিলরের জীবনের রেখচিত্র দেখলে হয়তো আরও খানিকটা পরিষ্কার হবে ব্যাপারটা। সেই মানুষটির জন্ম হয়েছিল পঞ্চাননতলা বস্তিতে এবং জীবনের প্রথম পঁয়ত্রিশ বছর সেখানেই কাটিয়েছেন তিনি। বারো বছর বয়সে ওয়াগন ‘ব্রেক’ করতে শিখেছেন, বাইশ বছরে মালিকের রিকশা নিয়ে চম্পট দিয়েছেন। এবার সত্যি বলতে, টানা তিনদিন ভাত খেতে না পেলে আমি বা আপনিও যে ওয়াগন ভেঙে চাল চুরি করতাম না, তা বলা যায় না। আর সারা দিন রিকশা চালিয়ে রোজগার করার পর কারই-বা ভাল লাগে সেই রক্ত জল-করা টাকার বৃহদংশ ‘মালিক’ নামের কোনও বিভীষিকার হাতে তুলে দিতে? বিগত পঞ্চাশ বছরের হ্যাংওভারে এসব ব্যাপারকে কিঞ্চিৎ ‘ইনকিলাব’ বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু কাউন্সিলর হওয়ার দশ বছরের মধ্যে সেই লোকটি সাউথ সিটিতে দু’-দুখানা ফ্ল্যাট কিনে নিয়েছেন বলে যখন জানা যায়, তখন একবাক্যে চমকে ওঠে প্রত্যেকে। এই সেদিনও যাকে বস্তির টিউকলের চাতালে বসে গায়ে সাবান ডলতে আর বালতিতে মগ ডুবিয়ে মাথায় জল ঢালতে দেখা গিয়েছিল, তার কি না সতেরো তলায় ফ্ল্যাট? কীভাবে সম্ভব?

এরা প্রত্যেকে যে স্বেচ্ছায় ছিলেন তা নয়, সাসপেনশন কিংবা দূরে বদলির ভয়েও ছিলেন অনেকে। মাথার পিছনে হকিস্টিক দিয়ে বাড়ি মেরে, সৈকত ভাওয়াল কিংবা সুদীপ্ত গুপ্তকে যেভাবে খুন করেছে, সেইভাবে মেরে দেবে, এই দুশ্চিন্তাও ছিল অনেকের।

কীভাবে সম্ভব, স্কুলে-স্কুলে বিলি করার জন্য কর্পোরেট সংস্থার ঘাড় ধরে আদায় করা ল্যাপটপগুলিকে ফের দোকানে বিক্রি করে দেওয়া? কীভাবে সম্ভব, আমফানের পর নিরন্ন, নিঃসম্বল মানুষের ঘর পুনর্নির্মাণের টাকাটুকু হাপিশ করে দেওয়া? কীভাবে সম্ভব, ঘরের কাছে বদলি করে দেওয়ার টোপ দিয়ে লাখ-লাখ টাকা আদায় কিংবা চিটফান্ডের থেকে লাখ-লাখ টাকা মাইনে বা অনুদান নেওয়া অভিনেত্রী বা পরিচালকদের একবারও তদন্তকারী
সংস্থার মুখোমুখি না হওয়া?

এই ‘কীভাবে সম্ভব’ শব্দ দুটোকেই উল্টো করে ঝুলিয়ে টাঙিয়ে দিয়েছিল তৃণমূল শাসন। আগে মানুষ আত্মহত্যা করতে চাইলে নিজের ঘরে, কিংবা খুব বেশি হলে বাড়ির উঠোনের গাছ থেকে ঝুলে পড়ত। কিন্তু তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেখা যেতে লাগল যে ত্রিলোচন মাহাতো কিংবা দুলাল মাহাতোর মতো তরতাজা যুবক হাইরোডের হাইটেনশন লাইন থেকে ঝুলছে, আর সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে– সেটাই আত্মহত্যা! খানিকটা একই ধাঁচে শিক্ষা আর স্বাস্থ্য: দু’টিকেই হাইটেনশন তার থেকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল তৃণমূল শাসন। আর সেই ঝোলানোর প্রক্রিয়ায়, তারিখ পেরিয়ে যাওয়া স্যালাইনের বোতল কেনা কিংবা মানুষের হাসপাতালে কুকুরের ডায়ালিসিস করা ডাক্তারদের মতোই ওএমআর শিটের নম্বর ওলটপালট করে দেওয়া অধ্যাপকগণও ছিলেন। ছিলেন, একই জমি অনেককে বিক্রির চক্রে জড়িত বিএলআরও, মিড-ডে মিলের খাবারের টাকা চুরির সঙ্গে জড়িত শিক্ষক কিংবা সিমেন্টের বদলে অন্য কিছু ব্যবহার করে, হেলে-পড়া বাড়ি বানিয়ে দেওয়া ইঞ্জিনিয়ার।

এরা প্রত্যেকে যে স্বেচ্ছায় ছিলেন তা নয়, সাসপেনশন কিংবা দূরে বদলির ভয়েও ছিলেন অনেকে। মাথার পিছনে হকিস্টিক দিয়ে বাড়ি মেরে, সৈকত ভাওয়াল কিংবা সুদীপ্ত গুপ্তকে যেভাবে খুন করেছে, সেইভাবে মেরে দেবে, এই দুশ্চিন্তাও ছিল অনেকের। ‘অভয়া বানিয়ে দেব’ তো লব্‌জ হয়ে গিয়েছিল তৃণমূলের অনেক নেতার। আইন কলেজে সবচেয়ে বে-আইনি কাজগুলো করত যারা, খবরের কাগজে বিরুদ্ধ-মতের একটি লেখা বেরলে, ব্লাস্ট ফার্নেসে ফেলে মারবে বলে হুমকি দিত যারা– তারা প্রত্যেকেই একটা ভয়ের শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল, যেখানে নির্বিবাদে পাড়ার পুকুরটাকে ছাই ফেলে বুজিয়ে দেওয়া যায়; তিনতলার পারমিশন নিয়ে পাঁচতলা বিল্ডিং খাড়া করা যায়; একলাইন কবিতা লিখতে না-পারা মুখ্যমন্ত্রীকে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারের জন্য রেকমেন্ড করা যায়, এমনকী, দরিদ্র মানুষ মারা গেলে তাঁর আত্মীয়রা সরকারের থেকে সামান্য যে টাকাটুকু পান, তারও একটি অংশ ‘কাটমানি’ হিসাবে কেটে নেওয়া যায়।

নব নালন্দার অনেক ছাত্রকে ইংরেজি পড়াতাম এক সময়ে। সেই সূত্রেই সেই ছেলেটির কথা শোনা, যে, ক্লাস এইটে প্রায় সব বিষয়ে ফেল করে বহিষ্কৃত হয়েছিল স্কুল থেকে। সেই ছেলেটির নামের হার্ডওয়্যার দোকান থেকে কলকাতার সব রাস্তা, সব অট্টালিকায় ব্যবহৃত রং যেত দীর্ঘ দিন। আর, তার পরিণামে হাজরা দুর্গামন্দিরের উলটোদিকে একটি প্রাসাদের পত্তন হল। কিন্তু সব বিষয়ে ফেল করেছিল বলেই ছেলেটি জানত না, বা এখনও জানে না হয়তো যে, পায়ের তলা থেকে মাটি টেনে নিলে, মানুষ যেমন উল্টে পড়ে, নদী কিংবা খনির ভিতর থেকে নির্বিচারে বালি বা কয়লা তুলে নিলে উলটে পড়ে তারাও।

সেই উলটে পড়ার আলেখ্যর ভিতর দিয়ে পরিবর্তন এসেছে পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু বিগত পনেরো বছর যা ঘটেছে তারপর, পশ্চিম বাংলার নদী, মাটি, খনি, প্রান্তর আর মানুষের স্বপ্ন সোজা হয়ে দাঁড়াতে, সময় লাগবে অনেক।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক শিক্ষক
[email protected]

আরও পড়ুন:

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের
ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ‘ – এর পাতায়।

চোখ রাখুন

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *