সুভাষ বর্মন, শালকুমারহাট: বর্ষাকাল নয়। অথচ অক্টোবর মাসেই পরপর দু’বার সোলেম মিয়াঁর বাড়িতে শিসামারা নদীর (Sisamara River) ডলোমাইটমিশ্রিত জল ঢুকে পড়েছিল। এরকম হলেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পরিজনদের নিয়ে ত্রাণশিবিরে রাত কাটাতে হয়। তাই এবার ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবছেন শালকুমারহাটের নতুনপাড়ার ষাটোর্ধ্ব সোলেম মিয়াঁ। তিনি শুধু একাই নন। এই শিসামারা নদীই এখন গ্রামবাসীর কাছে আতঙ্কের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নদী ও ভাঙা বাঁধ লাগোয়া গ্রামের অনেকেই ঘরবাড়ি সরানোর কথা জানিয়েছেন। কেউ কেউ অন্য গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ির পাশেই বাড়ি করবেন বলে ভাবছেন৷ এভাবে নদীর আতঙ্কে ভিটেমাটি ছাড়ার কথা নিয়ে এবারই প্রথম চর্চা হচ্ছে গোটা শালকুমারহাটে।
সোলেমের বাড়ি থেকে ২০০ মিটার দূরে শিসামারা নদী। বছরের পর বছর ধরে এই গ্রামেই বসবাস করছেন তিনি। দুই দশক আগেও শিসামারা নদীর পরিস্থিতি এরকম ছিল না। সোলেমের কথায়, ‘১৫-২০ বছর আগে শিসামারা ছিল একটি ছোট নদী। এখন সেটিই বড় নদীতে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় নদীর গর্জনে ঘুম হয় না। তবে এবারের মতো পরিস্থিতি আগে কখনও হয়নি। তাই অন্য গ্রামে জমি কিনে বাড়ি করার কথা ভাবছি।’
কেন ভিটেমাটি ছাড়তে চাইছেন? তাঁর সংযোজন, ‘এবার বর্ষাতে গ্রামে নদীর জল ঢোকেনি। তবে অক্টোবর মাসে পরপর দু’বার বাড়িতে জল ঢুকেছিল। তাই এখানে থাকার ইচ্ছেটাই হারিয়ে যাচ্ছে।’ শিসামারা বাঁধের পাশেই বাড়ি বজরুল মিয়াঁর। তিনিও আর এই গ্রামে থাকতে চাইছেন না। তাঁর কথায়, ‘ঘরবাড়িতে জল ঢুকে অনেক ক্ষতি হয়েছে। তবে তার থেকেও বেশি ক্ষতি হয়েছে সুপারি বাগান ও চাষের জমির। আমরা কৃষিকাজ করি। তা দিয়েই সংসার চলে। কিন্তু এই নদীর কারণে জীবিকানির্বাহ করাই এখন মুশকিল হয়ে পড়েছে।’
শুক্রবার নতুনপাড়া গ্রামের আরেক বাসিন্দা রতন রায়ের বাড়িতেও জল ঢুকে পড়ে। স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে রতন ত্রাণশিবিরে রাত কাটান। কিন্তু সেখানে ঘুম হয়নি। চিন্তা ছিল ঘরবাড়ির। শনিবার সকালে গিয়ে দেখেন বাড়ির জল নেমেছে। কিন্তু যে ঘরে থাকেন সেখানে এক ফুট পলি জমেছে। আর এই পলি হল ডলোমাইটের কাদা। কোদাল দিয়ে তা সরাচ্ছিলেন রতন। বললেন, ‘আমি কেরলে রাজমিস্ত্রির কাজ করি। পুজোর সময় বাড়ি এসেছি। তারপর বিপর্যয় ঘটে গেল। এখন আর বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না। অন্য গ্রামে আত্মীয়স্বজন আছেন। ভাবছি আত্মীয়দের জমিতেই বাড়ি করব। এখানে নদীর পাশে সন্তান নিয়ে থাকাটাই এখন দুশ্চিন্তার।’
শিসামারা নদীর জল নেপালিবস্তি, নতুনপাড়া, মুন্সিপাড়া, সিধাবাড়ি গ্রামেই বারবার ঢুকে পড়ছে। কারণ, এই গ্রামগুলি একেবারেই নদী ও বাঁধ ঘেঁষে। তবে গ্রামবাসীর অনেকের আত্মীয় রয়েছেন শালকুমারহাটের অন্যান্য গ্রামে। সেইসব গ্রামে অবশ্য নদীর জল ঢুকছে না। তাই নদী লাগোয়া বাসিন্দারা এখন কিছুটা দূরের গ্রামগুলিকেই নিরাপদ মনে করছেন। ইতিমধ্যে শিসামারা নদীর গ্রাসে ইতিমধ্যে অনেকের চাষের জমি, সুপারি বাগান তলিয়ে গিয়েছে। নতুনপাড়া গ্রামের আরেক বাসিন্দা সুরেশ রায়ের কথায়, ‘এখানে চোদ্দো বিঘা চাষের জমি আছে। সুপারি বাগানও আছে। তবে বাড়ি এখান থেকে সরাব৷ দূরের বাড়ি থেকেই চাষের জমি দেখভাল করব। তবু নদীর ভয়ে এখানে আর থাকব না।’
