সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: ভুল সংশোধন করে ফেলাটাও যে অনেক সময় বড় ভুল হয়ে যেতে পারে তা এই ভরা এসআইআর (SIR) লগ্নে অনেকেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। দুই দশক বা তারও বেশি সময় ধরে তিলে তিলে যে ভুল শুধরে নেওয়া হয়েছিল সেটাই যে এসআইআর বৈতরণি পার হওয়ার মূল চাবিকাঠি ছিল তা এই মুহূর্তে বেশ বুঝতে পারছেন। কিন্তু আর আগের পরিস্থিতিতে ফেরার যে কোনও উপায় নেই। এনুমারেশন ফর্ম ভরতে গিয়ে অনেকেই রাজনৈতিক নেতা, বিএলও-দের দোরে দোরে ঘুরছেন। কিন্তু সমস্যা মেটানোর কোনও উপায় না পেয়ে এঁদের অনেকেরই কালঘাম ছুটেছে।
বাবার নামের গেরোয় যাঁরা বিপদে পড়েছেন তাঁদের বেশিরভাগই চোরাপথে বা পাসপোর্ট করে এদেশে এসে প্রথমেই নাম বদলেছেন। এরপর কিছুদিন উত্তরবঙ্গ আবার কখনও দক্ষিণবঙ্গে পালা করে দিন কাটানোর পর সুযোগ বুঝে কাউকে বাবা সাজিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন। এরপর ধীরে ধীরে এক-দু’বছর পরপর সংশোধনীর জন্যে ফর্ম ফিলআপ, অ্যাফিডেভিট, স্থানীয় পঞ্চায়েত, কাউন্সিলারের সার্টিফিকেট, ম্যানেজ করা স্কুল সার্টিফিকেটের দৌলতে নিজের আসল নাম এবং পিতৃপরিচয় দিয়ে ভোটার তালিকা এবং আধার কার্ডে নাম তুলেছেন। এপর্যন্ত সবই ঠিক। কিন্তু এবারের এসআইআর পর্বই সব গণ্ডগোল করে দিয়েছে।
ঠিক কীভাবে ঘটনাটি ঘটছে তা একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা যাক। ধরা যাক এদেশে আসা মানুষটির নাম শ্যাম বোস। বাবার নাম যদু বোস। এদেশে এসে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের লক্ষ্যে শ্যাম প্রথমে মধু ঘোষ নামে কাউকে খুঁজে বের করলেন। ভারতে তৈরি পরিচয়পত্রে তার আগে নিজের পদবি ভাঁড়িয়ে শ্যাম নিজের নাম ‘শ্যাম ঘোষ’ করে নিয়েছেন। এবারে পরিচয়পত্রে বাবার নাম হিসেবে প্রথমে ‘মধু ঘোষ’ লিখেছেন। তারপর একপ্রস্থ সংশোধন–নাটক। এবারে বাবার নাম ‘মধু বোস’ করা হল। ইতিমধ্যেই শ্যাম নিজের পদবি বদলে ফের ‘বোস’ করে নিয়েছেন। তারপর আবারও একপ্রস্থ সংশোধন–পর্ব। বাবার নামে ভুল ছিল বলে জানিয়ে এবারে পরিচয়পত্রে বাবার নাম ‘যদু বোস’ করা হল। ব্যস, সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। নিজের বাবা পরিচয়পত্রে নিজের বাবা হিসেবেই রয়ে গেলেন। পাশাপাশি স্বনামে ভারতের বাসিন্দাও হওয়া গেল।
এনুমারেশন ফর্মে ২০০২ সালের বিষয়টিই এই শ্যামদের বিপাকে ফেলেছে। ভারতে সেবারের ভোটের তালিকায় যদু বোসের কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু মধু ঘোষের আছে। আর তাই ২০০২ সালের তালিকায় বাবার নাম হিসেবে শ্যাম নিজের নামের সঙ্গে যদুকে কোনওভাবেই মেলাতে পারছেন না। উপায় একটা আছে অবশ্য। মধু ঘোষকে যদি কোনওভাবে ফের বাবা হিসেবে নিজের পরিচয়পত্রে ফিরিয়ে আনা যায়। আর এই লক্ষ্যেই শ্যামরা আপাতত দিনরাত এক করে প্রশাসনের দোরে দোরে ঘুরছেন। প্রকাশ্যে কেউ অবশ্য কিছু বলতে চাইছেন না। বললে নিশ্চিতভাবে প্রশাসনের কোপে পড়ার আশঙ্কা।
রাজনৈতিক কর্মী থেকে বিএলও-দের সঙ্গে কথা বললেই জানা যাচ্ছে ধূপগুড়ি শহর এবং শহরতলি এলাকায় এই শ্যামদের সংখ্যা কম নয়। শহরের এক বুথে দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত বিএলও’র কথায়, ‘২০০২ এবং ২০২৫ সালে বাবার নামের ফারাক বিস্তর বলে কেউ পেঁচিয়ে আবার কেউ সোজাসুজি স্বীকার করে নিচ্ছেন। প্রথমে ৬ নম্বর ফর্মে নাম তোলার পর একাধিকবার ৮-ক ফর্মে বাবার নাম সহ নিজের এবং বাবার পদবি যে বদলে ফেলা হয়েছে তা বুঝতে পারছি। এরা কারা এবং অতীতে কীভাবে কী হয়েছে তাও বুঝতে পারছি কিন্তু কোনও সুরাহা দিতে পারছি না।’
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও বেশ চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিজেপির জলপাইগুড়ির সাধারণ সম্পাদক চন্দন দত্ত বললেন, ‘পিসি ভাইপো থেকে শুরু করে পাড়ায় চুনোপুঁটি তৃণমূল নেতাদের চড়া এসআইআর বিরোধিতা, ডাল মে জরুর কুছ কালা হ্যায় প্রমাণ করছে। আমরা চাইছি ভোটার তালিকা ভেজালমুক্ত হোক। ভিনদেশে অত্যাচারিত হয়ে যেসব সংখ্যালঘু মানুষ প্রাণ হাতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন তাঁদের জন্যে আমরা ইতিমধ্যেই সিএএ শিবির চালু করে দিয়েছি। আতঙ্কটা শুধু এদেশের শত্রুদের।’ শাসক শিবির অভিযোগ মানতে চায়নি। তৃণমূলের জেলা সাধারণ সম্পাদক রাজেশকুমার সিংয়ের কথায়, ‘২০০২ সালে এসআইআরের সময় তৃণমূল ক্ষমতায় ছিল না। সব সমস্যা ২০১১ সালের পরই হয়েছে বলে বিজেপি যে দাবি করছে তা নিতান্তই শিশুসুলভ। কোচবিহারের প্রাক্তন সাংসদের জন্মও নাকি ওপার বাংলায় বলে শোনা যাচ্ছে। তাহলে তাঁরও নিশ্চয়ই সিএএ হবে।’
The submit SIR | ভুয়ো বাবাকে ফেরাতে প্রার্থনা! এসআইআর-চাপে অনুপ্রবেশকারীরা appeared first on Uttarbanga Sambad.
