শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: ঝোপ বুঝে কোপ মারা বোধহয় একেই বলে। উপাচার্য নেই, বন্ধ কর্মসমিতির বৈঠকও। ক্যাম্পাস কার্যত অভিভাবকহীন। সেই সুযোগে আইন ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসাবে শিলিগুড়ি কলেজের (Siliguri Faculty) পরিচালন কমিটির সদস্য হয়ে বসলেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের (NBU) ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ভাস্কর বিশ্বাস। সদস্য হিসাবে নিজেই নিজেকে মনোনীত করেছেন তিনি। শুধু নিজেকেই নয়, ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন কলেজে পছন্দের লোকেদের পরিচালন কমিটির সদস্য হিসাবে মনোনীত করে চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন ভাস্কর। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের কীর্তি ফাঁস হতেই হইচই পড়েছে শিক্ষা মহলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কলেজগুলির পরিচালন কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন করে প্রতিনিধি থাকেন। মহিলা কলেজের ক্ষেত্রে দুজন প্রতিনিধির একজনকে অবশ্যই মহিলা হতে হয়। আইন ও বিধি অনুসারে উপাচার্য প্রতিনিধিদের নাম ঠিক করে কর্মসমিতিতে পাঠান। কর্মসমিতির অনুমোদনক্রমে তা চূড়ান্ত হয়। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করেই আলিপুরদুয়ার মহিলা মহাবিদ্যালয়, কামাখ্যাগুড়ি শহিদ ক্ষুদিরাম, ফালাকাটা, দার্জিলিংয়ের সাউথফিল্ড, নকশালবাড়ি, কালীপদ ঘোষ তরাই মহাবিদ্যালয় সহ বিভিন্ন কলেজে চিঠি দিয়ে প্রতিনিধিদের নাম পাঠিয়েছেন ভাস্কর। কলেজগুলিতে সেই প্রতিনিধিদের নিয়ে পরিচালন কমিটি পুনর্গঠনও হয়েছে।
সবকিছু ছাড়িয়ে গিয়েছে শিলিগুড়ি কলেজের পরিচালন কমিটির প্রতিনিধি হিসাবে ভাস্করের নিজেই নিজের নাম চূড়ান্ত করার ঘটনায়। বেশ কিছুদিন আগেই শিলিগুড়ি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের চিঠি পৌঁছেছে (Ref.no-281/R-2025)। নিজেকে ছাড়াও অন্য প্রতিনিধি হিসাবে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনলোজির অধ্যাপক শিল্পী ঘোষের নাম মনোনীত করেছেন ভাস্কর। এতদিন বিষয়টি ধামাচাপা থাকলেও সম্প্রতি সেইসব চিঠি প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়েছে। ক’দিন আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে রাজ্য তৃণমূল দলের শিক্ষক, অধ্যাপকদের সংগঠনের সব কমিটি ভেঙে দেওয়ার আগে পর্যন্ত ভাস্কর ওয়েবকুপার (তৃণমূলের অধ্যাপকদের সংগঠন) উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। পাছে প্রভাবশালী ভাস্করের রোষানলে পড়তে হয় তাই কলেজের অধ্যক্ষরা বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না।
ভাস্করের কীর্তিতে হতবাক রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য দীপক রায়। তাঁর কথা, ‘ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার যে কাজ করছেন তাতে দুটো বিষয় স্পষ্ট, হয় তিনি আইনকানুন কিছুই জানেন না, নতুবা তিনি সব জানেন কিন্তু আইনের তোয়াক্কা করেন না। যা হয়েছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। দ্রুত ওই বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ জরুরি। উপাচার্য ছাড়া অন্য কারও হাতেই কলেজের পরিচালন কমিটির সদস্য মনোনয়নের ক্ষমতা নেই।’ কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য দেবকুমার মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘আইনে কলেজের পরিচালন কমিটির প্রতিনিধি ঠিক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে উপাচার্যকে। তার বাইরে অন্য কোনও আধিকারিক ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন না।’
বেআইনিভাবে কেন প্রতিনিধি মনোনয়ন করলেন? ভাস্করের ব্যাখ্যা, ‘সিএম রবীন্দ্রন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য থাকাকালীন অ্যাডভাইজারি দিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রেজিস্ট্রারের হাতে দিয়েছিলেন। সেই ক্ষমতাবলেই বিভিন্ন কলেজের পরিচালন কমিটির প্রতিনিধি ঠিক করে পাঠানো হয়েছে। কলেজগুলির স্বার্থেই সেই কাজ করা হয়েছে।’ ভাস্করের ব্যাখ্যা ওয়েবকুপার অভ্যন্তরেই শোরগোল ফেলে দিয়েছে। রবীন্দ্রনকে উপাচার্য হিসাবে মান্যতা দেয়নি রাজ্য সরকার। তাই রবীন্দ্রনকে বেতনও দেওয়া হয়নি। এমনকি চিঠি দিয়ে রাজ্য শিক্ষা দপ্তর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন না রবীন্দ্রন। পাবেন না কোনও সুযোগসুবিধাও। রবীন্দ্রনের অ্যাডভাইজারির যে কোনও আইনি বৈধতা নেই সেকথাও বারবার বলেছেন শিক্ষা দপ্তরের কর্তারা। পরবর্তীতে শিক্ষা দপ্তর অ্যাডভাইজারি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় রাজ্যের অনুমোদন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও বিষয়েই কোনওরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। সেই অ্যাডভাইজারি এখনও বলবৎ আছে। তাকে পাত্তা না দিয়ে কেন হঠাৎ রবীন্দ্রনের অ্যাডভাইজারিকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছেন ভাস্কর তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। তাহলে কি রাজ্য সরকারের চাইতেও রবীন্দ্রনের অ্যাডভাইজারি ভাস্করের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকেই।
তবে গোটা বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর কলেজগুলির পরিচালন কমিটির বৈধতা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। বেআইনিভাবে নিয়োগ হওয়া প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত পরিচালন কমিটির সিদ্ধান্ত আদৌ আইনত স্বীকৃত হবে কি না সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে আলিপুরদুয়ার থেকে দার্জিলিং সর্বত্র।
