শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি: সুপারি ব্যবসার আড়ালে প্রায় আড়াইশো কোটি টাকার জিএসটি কারচুপির তদন্তে নেমে শহর শিলিগুড়িতে (Siliguri) আচমকা হানা দিল ডাইরেক্টরেট জেনারেল অফ জিএসটি ইন্টেলিজেন্স বা ডিজিজিআই। ডিজিজিআই (DGGI)-এর একটি বিশেষ দল এদিন সকাল থেকেই শহর এবং শহর সংলগ্ন এলাকার অত্যন্ত পরিচিত ব্যবসায়ী নারায়ণ আগরওয়ালের বিভিন্ন ডেরায় তল্লাশি শুরু করে।
শহর সংলগ্ন উত্তরায়ণ টাউনশিপে ব্যবসায়ীর বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। সেই বাড়ির পাশাপাশি সেবক রোডে থাকা ব্যবসায়ীর সোনার দোকানেও এদিন কড়া নিরাপত্তায় হানা দেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। সব মিলিয়ে প্রায় আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান চলে। সূত্রের খবর, উত্তরায়ণের বাড়ি থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ এবং নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করেছে ডিজিজিআই-এর টিম।
যদিও এদিনের এই দীর্ঘ অভিযান ঘিরে ওই ব্যবসায়ীর পরিবারের সদস্যদের তরফে সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনওরকম মন্তব্য করা হয়নি। অভিযান চলাকালীন ওই ব্যবসায়ী বাড়িতে ছিলেন না বলেও খবর। এদিকে, গোটা তল্লাশি অভিযান এবং তদন্তের বিষয়ে ডিজিজিআই-এর টিমের তরফেও এদিন সরকারিভাবে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটান পুলিশের ডিসিপি (ইস্ট) রাকেশ সিংকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এই তল্লাশি অভিযানের ব্যাপারে শিলিগুড়ি পুলিশকে আগে থেকে কোনও বার্তা দেওয়া হয়নি।
শহরের ব্যবসায়ী মহলে নারায়ণ আগরওয়াল মূলত ‘সুপারি কিং’ হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিত। একসময় তিনি নকশালবাড়িতে বসবাস করলেও, বেশ কয়েকবছর ধরে তিনি শহর সংলগ্ন উত্তরায়ণ টাউনশিপে একটি বিলাসবহুল বাড়ি বানিয়ে সেখানেই বসবাস করে আসছেন। তাঁর ব্যবসার পরিধি কেবল সুপারিতেই সীমাবদ্ধ নয়। শিলিগুড়ির সেবক রোডে তাঁর একটি সোনার দোকানও রয়েছে। এছাড়াও তিনি শহরজুড়ে চলতে থাকা বিভিন্ন বড় বড় নির্মাণকাজেও নিয়মিত আর্থিক লগ্নি করেন বলে খবর।
ঘটনার সূত্রপাত এদিন সকাল সাতটা নাগাদ। প্রথমে ওই বিলাসবহুল বাড়ির সামনে ডিজিজিআই-এর একটি টিম এসে পৌঁছায়। টিমটি সোজা বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি শুরু করে। এরপর সকাল সাড়ে আটটার দিকে ওই বাড়ির সামনে আরও তিনটে গাড়িতে করে ডিজিজিআই-এর আরও তিনটে টিম এসে হাজির হয়। এই চার টিমের সদস্যরা বেশ কিছুক্ষণ ধরে একসঙ্গে সেই বাড়িতে তল্লাশি চালানোর পর, তাঁদের মধ্যে থেকে একটি টিম সোজা সেবক রোডে থাকা সোনার দোকানে চলে যায়। সেখানে দুপুর পর্যন্ত একটানা চলে তল্লাশি। অন্যদিকে, বাকি তিনটি টিমও দুপুর প্রায় তিনটে পর্যন্ত উত্তরায়ণের বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায়। এরপর বাড়ির ভেতর থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি বাজেয়াপ্ত করে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।
ডিজিজিআই সূত্রে খবর, চলতি বছরের শুরুর দিকেই তাদের কাছে জিএসটি ফাঁকি সংক্রান্ত একটি চক্রের খবর এসে পৌঁছায়। সেই সূত্রকে কাজে লাগিয়েই তদন্তে নেমে মিরাট থেকে সঞ্জিত কুমার, শিবম ত্রিবেদী এবং দিলীপকুমার ঝা নামের তিনজন ট্রেডার্স ও ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীকে তারা গ্রেপ্তার করে। গতমাসের ২ তারিখ তাদের জেল হেপাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই ঘটনার বিস্তারিত তদন্তে নেমে আধিকারিকরা দেখতে পান যে, সঞ্জিতই এই পুরো জালিয়াতিচক্রের মাস্টারমাইন্ড। এই চক্রের সমস্ত অবৈধ কাজ মূলত কার্যকর করেছিলেন শিবম। তিনি তাঁর অ্যাকাউন্ট্যান্টের মাধ্যমে বিজনেস টু কাস্টমার বা বি-টু-সি মডেলের নামে একাধিক ভুয়ো ইনভয়েস তৈরি করেছিলেন। এরপর সুকৌশলে বিজনেস টু বিজনেস বা বি-টু-বি মডেলকে বি-টু-সি হিসেবে ভুয়োভাবে দেখাচ্ছিলেন। অর্থাৎ খাতায়-কলমে সাধারণ খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছে সুপারি বিক্রি করার কথা বলা হলেও, তদন্তে জানা যায়, বাস্তবে সেই বিপুল পরিমাণ সুপারি চলে যাচ্ছিল বড় বড় পানমশলা নির্মাণকারী সংস্থাগুলির কাছে আর এই গোটা ঘটনার তদন্তের সূত্র ধরেই নারায়ণ আগরওয়ালের নাম সরাসরি তদন্তকারীদের সামনে চলে আসে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই এদিন নারায়ণের বাসভবন এবং সোনার দোকানে আচমকা হানা দেয় ডিজিজিআই-এর টিম।
