তমালিকা দে, শিলিগুড়ি : স্কুল বারান্দাই যেন ক্লাসরুম। সেখানে বসেই পরীক্ষা দিচ্ছে বাঘা যতীন পার্কের ডাবগ্রাম ২ নম্বর জিএসএফপি স্কুলের পড়ুয়ারা। স্কুলে ক্লাসে না বসে পড়ুয়ারা এভাবে বারান্দায় কেন? ছেলেকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে আসা এক অভিভাবককে প্রশ্ন করতেই একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ল তাঁর গলায়, ‘এই তো সরকারি স্কুলের হাল। পড়ুয়া নয় যেন গোরু-ছাগলকে খাঁচায় আটকে রাখা হয়েছে। জানুয়ারি মাস থেকেই শুরু হতে চলছে নতুন শিক্ষাবর্ষ। সরকারি স্কুলের এই পরিকাঠামো হলে পড়ুয়া সংখ্যা বাড়বে কী করে?’
শিলিগুড়ি পুরনিগম থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে এই স্কুল। প্রধান গেট দিয়ে স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল বারান্দায় বেঞ্চ পাতা রয়েছে। সেখানে বসেই পরীক্ষা দিচ্ছে পড়ুয়ারা। বেসরকারি স্কুলগুলো যেখানে পড়ুয়াপিছু একটা করে চেয়ার-ডেস্ক দিচ্ছে সেখানে সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের জন্য একটা ক্লাসরুম নেই কেন? স্কুলের শিক্ষক অভিষেক বসু বলেন, ‘স্কুলে দুটো রুম রয়েছে। একটা শিক্ষকদের বসার, অন্যটা পড়ুয়াদের। ক্লাসরুমের অভাবে বারান্দায় বেঞ্চ পেতেই ছাত্রছাত্রীদের বসানো ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।’
শিলিগুড়ি বাঘা যতীন পার্কের এক প্রান্তে ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্কুলটি। একসময় পড়ুয়াদের ভিড়ে গমগম করত স্কুল চত্বর। কিন্তু পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে কোনও নজর দেওয়া হয়নি। আর তার জেরে ২০২৩ সালে ৩০০-র বেশি পড়ুয়া থাকা এই স্কুলে বর্তমান পড়ুয়া সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮০। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছুটিতে থাকায় দায়িত্বে থাকা শিক্ষিকা দেবশ্রী অধিকারী বলেন, ‘স্কুলের নিজস্ব জমি রয়েছে। সেখানে নতুন ক্লাসরুম তৈরির জন্য মাটি পরীক্ষাও করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরে আর কাজের কাজ কিছু হয়নি। পরিকাঠামো দেখে অভিভাবকরা প্রায়শই অভিযোগ করছেন। অনেকেই বাড়ির বাকি বাচ্চাদের ভর্তি করতে চাইছেন না।’
শুধু যে ক্লাসরুম নেই তা নয়, স্কুলে মিড-ডে রান্নার ঘর পর্যন্ত নেই। খোলা আকাশের নীচেই পড়ুয়াদের জন্য রান্না হয় মিড-ডে মিল। ছেলেকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে এসে এক অভিভাবকের অভিযোগ, সরকারি স্কুল তো এখন গরিব ঘরের বাচ্চাদের জন্য। এদের শরীর খারাপ হলেও কারও কিছু আসে যায় না। না হলে এত বছর ধরে মিড-ডে মিলের রান্না এভাবে করতে হয়?
বেসরকারি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলগুলোর দাপটে অনেকটা কোণঠাসা সরকারি স্কুল। ডিজিটাল লার্নিংয়ের সঙ্গে পড়ুয়ারা কীভাবে ছোট থেকেই পরিচিত হতে পারবে সেই চেষ্টা করা হচ্ছে বেসরকারি স্কুলগুলোতে। সেখানে সরকারি স্কুলের এমন দশা কেন তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। প্রাকপ্রাথমিক থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত বাগরাকোটের বাসিন্দা রাজু সরকারের ছেলে এই স্কুলে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বড় ছেলেকে এই স্কুলে পড়িয়েছি, কিন্তু ছোট মেয়েকে আর এখানে পড়াব না। বাইরে থেকে দেখেই বুঝতে পারি পরিকাঠামোর কোনও উন্নতি হয়নি। শুধুই আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না।’
কেন এই স্কুলের খুদে পড়ুয়াদের ক্লাসরুমটুকুও জোটে না? শিলিগুড়ি শিক্ষা জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের চেয়ারম্যান দিলীপকুমার রায় বলছেন, ‘আশা করি জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু হবে।’
