অনিকেত রায়, শিলিগুড়ি: ‘অন্ধজনে দেহো আলো’—অন্ধ মানেই আলোর মুখাপেক্ষী তা হয়তো নয়। কিছু মানুষের লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত তাঁর জীবনে ও সমাজে আলোর দিশা দেখিয়ে হয়ে ওঠে আলোর পথযাত্রী। এমনই এক মানুষ নকশালবাড়ির শিবা বিশ্বকর্মা।
তাঁর এক হাতে ব্লাইন্ড স্টিক, অন্য হাতে থাকার কথা ছিল সাহায্যের হাত। এই চিরাচরিত ছবিতে ছেদ টেনেছেন তিনি নিজেই। শিবার অন্য হাতে যেন হাতিয়ার ধূপকাঠির প্যাকেট। এই ধূপকাঠি বিক্রিতেই দিনগুজরান করেন তিনি।
সোল পাতলা হয়ে আসা চপ্পলে শরীরের ভর রেখে এই চড়া রোদেও পিঠে একটি ব্যাগ। তাতে নিজস্ব কিছু সারাদিনের প্রয়োজনীয় জিনিস ও কয়েক প্যাকেট ধূপকাঠি বোঝাই করে শিলিগুড়ির (Siliguri) বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ফেরি করাতেই জীবনের ছন্দ তাঁর। বাড়িতে আছেন তাঁর স্ত্রী বীরা ও মেয়ে রিনিতা। বীরাও বিশেষভাবে সক্ষম। মেয়ে একটি বেসরকারি স্কুলের ক্লাস ওয়ানের পড়ুয়া। কিন্তু ওই যে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সন্তানকে ঘিরে বাবাদের লড়াই ও স্বপ্নকে আলাদা করতে পারে না। তাই ওই একরত্তিকে সুন্দর জীবন উপহার দেওয়ার জন্য নকশালবাড়ি থেকে শিলিগুড়িতে এসে পুজোর আগে কঠোর পরিশ্রমের কাঠামো তৈরি করছেন শিবা।
শিবা প্রতিদিন শিবমন্দির থেকে ধূপকাঠি বিক্রি করা শুরু করেন। তারপর হাঁটতে হাঁটতে তাঁর পথ বিস্তৃত হতে থাকে শিবমন্দির, কোর্ট মোড়, ঘোগোমালি, আশিঘর, চম্পাসারি। কখনও আবার ধূপকাঠি বিক্রির জন্য ঘুরে বেড়ান জলপাই মোড়, মিলনপল্লি, বাবুপাড়া, এসএফ রোড সহ শহরের আরও আনাচকানাচে।
থানা মোড়ে ধূপকাঠি ফেরি করতে করতে শিবা বললেন, ‘এর আগে অন্য কাজ করলেও তিন মাস ধরে এই কাজই করছি। বেশিরভাগ দিনই যে সব ধূপকাঠি বিক্রি হয় তা নয়, তবে প্রতিদিনই অল্প কিছু হলেও বিক্রি হয়। প্রতি ধূপকাঠির প্যাকেটে লাভ পাঁচ টাকা। আমাকে অনেক সময়ই অনেক ক্রেতা ভালোবেসে কিছু বাড়তি টাকা দেন। এই যেমন দু’দিন আগে চম্পাসারি এলাকায় একজন এত আন্তরিকভাবে হাতে ৫০০ টাকা গুঁজে দিলেন, না করতে পারিনি। তবে সংসারে আয় বলতে আপাতত এই ধূপকাঠি বিক্রির টাকাই। আর ‘প্রতিবন্ধী ভাতা’-র ১০০০ টাকা।’
পুজো আসছে বলে আশায় রয়েছেন শিবা। তাঁর বিশ্বাস, শেষ দু’একদিনে তাঁর বিক্রিবাটা ভালোই হবে। এখনই অনেকে পুজোর আবহে ধূপকাঠি কিনে রাখছেন শিবার থেকে। তাই পুজোর সময়েও তিনি নিজের জায়গার পুজোর আমেজ ছেড়ে এই শহরে আসবেন ধূপকাঠি বিক্রি করতে। তাতে হয়তো শিবার পুজোয় হওয়া নতুন জামার গন্ধ থাকবে না, কিন্তু থেকে যাবে এই মহামিলনের স্রোতে মিশে থাকা তাঁর সংগ্রামের নিজস্ব সুবাস।
