রিয়াধ: সৌদি আরব বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দিগন্তবিস্তৃত ধু-ধু বালুচর, তপ্ত মরুভূমি আর প্রখর রোদ। কিন্তু গত কয়েকদিনে আরবের বুক থেকে আসা কিছু ছবি বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। রুক্ষ মরুভূমি এখন সাদা বরফের (Saudi Arabia Snowfall) চাদরে ঢাকা! আল-জাওফ প্রদেশের সোনালি বালির ঢিবিগুলো রাতারাতি রূপ নিয়েছে কোনও এক রূপকথার শৈলশহরের। পর্যটকদের কাছে এই দৃশ্য রোমাঞ্চকর মনে হলেও পরিবেশবিদদের কপালে কিন্তু এখন চিন্তার ভাঁজ।
প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নাকি বিপদের পূর্বাভাস?
সৌদি আরবের মতো চরম ভাবাপন্ন মরু অঞ্চলে তুষারপাত স্রেফ কোনও বিরল প্রাকৃতিক ঘটনা বা ‘অলৌকিক’ বিষয় নয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এটি আসলে ‘ক্লাইমেট অ্যানোম্যালি’ বা জলবায়ুর অস্বাভাবিক আচরণের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। যেখানে একফোঁটা বৃষ্টির জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে বরফের স্তূপ প্রমাণ করছে যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দ্রুত ভারসাম্য হারাচ্ছে।
কেন এমনটা ঘটছে?
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, উত্তর মেরুর গ্রিনল্যান্ডে অস্বাভাবিক হারে বরফ গলছে। এর ফলে সমুদ্রের জলস্তর যেমন বাড়ছে, তেমনই পালটে যাচ্ছে বায়ুপ্রবাহের গতিপথ। বায়ুমণ্ডলের এই ওলটপালট হওয়ার কারণেই তপ্ত মরুভূমিতে তুষারপাত হচ্ছে, আবার অনেক শীতল দেশে দেখা দিচ্ছে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ। প্রকৃতি যেন আর্তনাদ করে আমাদের জানান দিচ্ছে যে, সে অসুস্থ।
ভারতের পরিস্থিতি কি হাতের বাইরে?
সৌদি আরবের এই বরফ কেবল আরবের সমস্যা নয়, এটি ভারতের জন্য এক বড়সড়ো সতর্কবার্তা। এদেশের কৃষি ব্যবস্থা, জল ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনা, সবটাই নির্দিষ্ট ঋতুচক্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে।
এক, কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয়: অসময়ে বৃষ্টি বা তুষারপাত ভারতের শস্যচক্রকে তছনছ করে দিচ্ছে।
দুই, শহরাঞ্চলে হাহাকার: একদিকে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে মৃত্যুমিছিল, অন্যদিকে হড়পা বানে ডুবে যাচ্ছে আধুনিক শহর।
উত্তরবঙ্গের জন্য বার্তা কী? (What’s the message for North Bengal?)
বিশ্ব উষ্ণায়নের এই প্রভাব থেকে আমাদের উত্তরবঙ্গ কিন্তু মুক্ত নয়। ডুয়ার্সের চা বাগান থেকে শুরু করে পাহাড়ের চূড়া-অসময়ে বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা কিংবা শীতের খামখেয়ালিপনা আমরা ইদানীং প্রায়ই অনুভব করছি। আরবে তুষারপাত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির এই পরিবর্তন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এক গ্লোবাল ওয়ার্নিং বা বিশ্বজনীন সতর্কতা।
পথ কোন দিকে?
সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল ‘অ্যাডাপ্টেশন’ বা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিলে চলবে না, প্রয়োজন ‘মিটিগেশন’ বা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানোর মরিয়া চেষ্টা। কার্বন নিঃসরণে রাশ টানা, গাছ লাগানো এবং প্লাস্টিক দূষণ ঠেকাতে কঠোর না হলে আগামী দিনে মরুভূমি যেমন বরফে ঢাকবে, তেমনই অনেক জনপদ তলিয়ে যেতে পারে সমুদ্রের নীচে।
মরুভূমির বালুচরে তুষারপাত হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করার জন্য চমৎকার বিষয়, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির হাহাকার শোনাটাই এখন সময়ের বড় দাবি। উত্তরবঙ্গ থেকে আরব-পৃথিবীটা একটাই, আর তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়ভারও আমাদের সবার।
