উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের চাঞ্চল্যকর বাবা ও ছেলেকে নৃশংসভাবে খুনের মামলায় বড়সড় রায় দিল জঙ্গিপুর মহকুমা আদালত। সোমবার হরগোবিন্দ দাস ও চন্দন দাস হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত ১৩ জনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিলেন বিচারক অমিতাভ মুখোপাধ্যায়। কারাদণ্ডের পাশাপাশি দোষীদের মোট ১৫ লক্ষ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: চলতি বছরের ১২ এপ্রিল, ওয়াকফ আইন সংশোধনী নিয়ে এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালীন আক্রান্ত হন হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন দাস। অভিযোগ ওঠে, অভিযুক্তরা বাড়ির দরজা ভেঙে তাঁদের টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় বের করে আনে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই ঘটনায় গোটা রাজ্য জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল।
তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া: হত্যাকাণ্ডের গুরুত্ব বুঝে জেলা পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (SIT) গঠন করে। তদন্তে নেমে পুলিশ ৯৮৩ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত চার্জশিট জমা দেয়, যেখানে ঘটনার পৈশাচিকতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল। যদিও এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক রাজনীতি হয়েছিল, কিন্তু পুলিশ প্রথম থেকেই দাবি করে এসেছে যে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরেই এই খুন। মোট ৩৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ফরেনসিক রিপোর্টের ভিত্তিতে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
আদালতের রায়: গত ১৬ ডিসেম্বর মামলার শুনানি শেষ হয়েছিল। সোমবার কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় অভিযুক্তদের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক অমিতাভ মুখোপাধ্যায় তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করেন এবং সাজা ঘোষণা করেন। আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার ও আইন মহলের একাংশ। বিচারক জানান, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করেই এই সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও আইনজীবীর বয়ান
কান্নায় ভেঙে পড়লেন নিহতের পরিজন: আদালতের রায় শোনার পরই এজলাসের বাইরে কান্নায় ভেঙে পড়েন হরগোবিন্দ দাসের স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। চোখের জল মুছতে মুছতে তাঁরা বলেন, “আজ আমাদের ভগবান বিচার দিয়েছেন। আমাদের ঘর অন্ধকার করে দেওয়া হয়েছিল, আজ দোষীরা সাজা পাওয়ায় কিছুটা শান্তি পেলাম। তবে আমাদের মানুষগুলো তো আর ফিরবে না।” পরিবার সূত্রে জানানো হয়েছে, অপরাধীদের এই কঠোরতম সাজা অন্যদের জন্য এক সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।
কী বললেন সরকারি আইনজীবী? জঙ্গিপুর আদালতের সরকারি আইনজীবী বলেন, “এটি অত্যন্ত নৃশংস এবং বিরল একটি অপরাধ ছিল। আমরা প্রথম থেকেই আদালতের কাছে সর্বোচ্চ সাজার দাবি জানিয়েছিলাম। পুলিশের পেশ করা ৯৮৩ পাতার চার্জশিট এবং ৩৮ জন সাক্ষীর বলিষ্ঠ বয়ান এই মামলা প্রমাণ করতে সাহায্য করেছে। ১৫ লক্ষ টাকার যে জরিমানা করা হয়েছে, তার একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দেওয়ার আবেদন জানানো হতে পারে।”
অন্যদিকে, আসামী পক্ষের আইনজীবীরা এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, মামলার রায়ে কিছু আইনি ফাঁক রয়ে গিয়েছে।
এই রায় ঘোষণার জেরে যাতে নতুন করে কোনও উত্তেজনা না ছড়ায়, তার জন্য আজ সকাল থেকেই জঙ্গিপুর আদালত চত্বরে ব্যাপক পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
