উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা এবং তা নিয়ে আমেরিকার ‘দুমুখো’ নীতি ও শুল্ক রাজনীতির বিরুদ্ধে এবার বেনজিরভাবে সরব হলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S Jaishankar)। সম্প্রতি ফিনল্যান্ডে ভূরাজনীতি সংক্রান্ত এক আলোচনা সভায় যোগ দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) নীতিকে কড়া ভাষায় কটাক্ষ করেছেন তিনি। জয়শঙ্করের স্পষ্ট বক্তব্য, একসময় বিশ্ববাজারে জ্বালানির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমেরিকাই ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার (Russian Oil) পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু ভারত তেল কেনা শুরু করতেই ভোলবদল করে নয়াদিল্লির ওপর বিপুল শুল্ক চাপিয়ে দেয় ওয়াশিংটন।
ফিনল্যান্ডের ওই অনুষ্ঠানে বিদেশমন্ত্রী (Ministry of Exterior Affairs) বলেন, “২০২২ সালে আমেরিকা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, বিশ্ব তেলের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনতে পারে ভারত। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে যখন আমরা রুশ তেল কেনা শুরু করলাম, ঠিক তার পরপরই অবস্থান থেকে সরে এসে আমেরিকা একের পর এক শুল্ক আরোপ করে। আবার পরে সেই শুল্ক তুলেও নেয়।” ট্রাম্প প্রশাসনের এই দ্বিচারিতাকেই ‘দুমুখো নীতি’ বলে দেগে দিয়েছেন জয়শঙ্কর।
উল্লেখ্য, রাশিয়ার কাছ থেকে খনিজ তেল কেনার বিষয়ে নয়াদিল্লির অনড় মনোভাবের কারণে গত বছর থেকে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিশেষ জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে ভারতীয় পণ্যের ওপর প্রথমে ২৫ শতাংশ এবং পরে রাশিয়ার থেকে তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক (Tariffs) চাপিয়ে দেন। ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট থেকে ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের ওপর এই মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়, যা ছিল সমগ্র এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্য যথেষ্ট ধাক্কা খায়। ট্রাম্পের দাবি ছিল, ভারতের দেওয়া তেলের টাকায় মস্কো ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাচ্ছে।
ইউক্রেনে রুশ হামলার পরও রাশিয়ার প্রতি ভারতের এই ‘সহানুভূতি’ কেন? এর নেপথ্যে কি শুধুই সস্তা তেল? অনুষ্ঠানে ওঠা এই ধারালো প্রশ্নের জবাবে জয়শঙ্কর সাফ জানান, ভারত কোনো ভূরাজনৈতিক সমীকরণ দেখে তেল কেনে না। তেল কেনা হয় সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থে দাম এবং সহজলভ্যতার ওপর ভিত্তি করে।
পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বিদেশমন্ত্রী বলেন, “সেই সময় রাশিয়াতে তেল সহজলভ্য ছিল। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) থেকে ইউরোপীয় দেশগুলি বিপুল পরিমাণে তেল কেনা শুরু করে। ভারতও বরাবর পশ্চিম এশিয়া থেকেই তেল কিনত। কিন্তু ইউরোপ সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ায় ভারতের কাছে একমাত্র বিকল্প ছিল রুশ তেল। পরিস্থিতি আমাদের দিক পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে।”
রাশিয়ার পাশে থাকা নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার সমালোচনার জবাবে ইউরোপকেও তীব্র আক্রমণ করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। ইউরোপীয় অস্ত্রের কারণে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ভারতে তৈরি অস্ত্র দিয়ে কখনও ইউরোপের কোনও দেশে হামলা হয়নি। ভালো হতো, যদি এই কথাটাই আমি ইউরোপের ক্ষেত্রে বলতে পারতাম। ইউরোপ যে অস্ত্র বিক্রি করে, তা দিয়েই ভারতের ওপর হামলা হয়। এখন বলে নয়, বছরের পর বছর ধরে তা হয়ে আসছে। আমার মনে হয় এই বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার ভাবা উচিত।”
জয়শঙ্কর স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আমেরিকা বা ইউরোপের কথায় নয়, ভারত সবসময় নিজের দেশের অর্থনীতি এবং কোটি কোটি মানুষের স্বার্থ বিচার করেই সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভবিষ্যতেও নেবে।
