শুভদীপ শর্মা, লাটাগুড়ি: ইকো সেনসিটিভ জোনের সমীক্ষা করতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ প্রশাসনের কর্তাদের। সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, ইকো সেনসিটিভ জোনের বাইরে হলেও মাল ও ক্রান্তি ব্লকে অন্তত আটটি রিসর্ট (Resort) গ্রাম পঞ্চায়েতের থেকে অনুমতি নিয়েই পুরোপুরি অবৈধভাবে নেওড়া নদীর চর দখল করে বা নদীর বুকে গড়ে উঠেছে। পাহাড়ি নদীর গতিপথ আটকে কীভাবে রিসর্ট গড়ে তোলার অনুমতি দেওয়া হল তা নিয়েও উঠছে প্রশ্নচিহ্ন? পাশাপাশি হঠাৎ করে হড়পা এলে, এই রিসর্ট ও রিসর্টে থাকা পর্যটকদের সুরক্ষার দায়িত্ব কে নেবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন মালের মহকুমা শাসক শুভম কুন্ডল।
গত কয়েকদিন ধরে গরুমারা জঙ্গল (Gorumara) সংলগ্ন এলাকায় ইকো সেনসিটিভ জোন চিহ্নিতকরণ করার কাজ শুরু হয়েছে প্রশাসনের তরফে। গরুমারা জাতীয় উদ্যান থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে যে সমস্ত রিসর্ট রয়েছে সেগুলি ইকো সেনসিটিভ জোনের মধ্যে পড়ছে। মাল মহকুমার মেটেলি, মাল ও ক্রান্তি ব্লকে এই ইকো সেনসিটিভ জনের মধ্যে কোন কোন রিসর্ট পড়ছে তার সমীক্ষার কাজ চালাতে গিয়ে প্রশাসনের কর্তাদের নজরে এসেছে অবাক করার মতো কিছু তথ্য।
সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, ক্রান্তি ও মাল ব্লকের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদী নেওড়ার দু’পাশে নদীর চর দখল করে গড়ে উঠেছে অন্তত আটটি রিসর্ট। সরকারি খাসজমিতে একেবারে নদী দখল করে কীভাবে রিসর্ট গড়ে উঠল? প্রশাসনের এক কর্তা জানিয়েছেন, এই সমস্ত রিসর্টের বিল্ডিং প্ল্যানের পাশাপাশি, ট্রেড লাইসেন্সও পুরোপুরি অবৈধভাবে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে দেওয়া হয়েছে। তার জন্য গ্রাম পঞ্চায়েতের ফান্ডে টাকাও নেওয়া হয়েছে। সমীক্ষকরা জানতে পেরেছেন, বেশিরভাগ রিসর্টের মালিক দক্ষিণবঙ্গের। স্থানীয় কাউকে সামনে রেখে তাঁরা এভাবে বিপজ্জনক ব্যবসা চালাচ্ছেন।
গতবছর সরকারি এমনই খাসজমিতে গড়ে ওঠা বেশ কিছু রিসর্টের সীমানা প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল প্রশাসনের তরফে। তারপরেই অবশ্য সরকারি খাসজমিতে গড়ে ওঠা এই সমস্ত রিসর্ট লিজের জন্য আবেদন জানায় প্রশাসনের কাছে। ইকো সেনসিটিভ জোনের কাজ খতিয়ে দেখতে বন দপ্তর এবং ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের তরফে একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। এই কমিটিকে সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা রিসর্টগুলির নথি খতিয়ে দেখতে বলা হয়। এই কমিটি নদীর মধ্যে গড়ে ওঠা রিসর্টগুলির লিজের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন দেখার।
লাটাগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কৃষ্ণা রায় বর্মন ও কুমলাই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সুনীতা মুন্ডার প্রায় একই বক্তব্য। তাঁরা জানান, এই রিসর্টগুলি অনেকদিন আগেই গড়ে উঠেছে। সেই সময় তাঁরা প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন না। তবে কীভাবে রিসর্টগুলিকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, সেই বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। মালের ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক প্রীতি লামা বলেন, ‘বন দপ্তরকে সঙ্গে নিয়েই ইকো সেনসিটিভ জোনের সমীক্ষার কাজ চলছিল। এই বিষয়ে সরকারি নির্দেশ কী রয়েছে সেটা দেখেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, পাহাড়ি নদী নেওড়ায় হড়পা আসতেই পারে। সেক্ষেত্রে নদীর বুকে গড়ে ওঠা ওই রিসর্টগুলিতে পর্যটক ও কর্মীদের ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে। রিসর্টগুলিকে লিজ দেওয়ার আগে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
ময়নাগুড়ি কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক মধুসূদন কর্মকার মনে করেন, নদীর বুকে এভাবে রিসর্ট করা কখনোই উচিত নয়। প্রশাসনের এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পরিবেশপ্রেমী যৌথ মঞ্চের উত্তরবঙ্গের আহ্বায়ক অনির্বাণ মজুমদার বলেন, ‘নদী দখল করে রিসর্ট গড়ে তোলার অনুমতি কীভাবে গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে দেওয়া হল, তা তদন্তের পাশাপাশি অবৈধ রিসর্টগুলির বিরুদ্ধে অবিলম্বে প্রশাসনের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’
গরুমারার ইকো সেনসিটিভ জোনের প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, গরুমারা জঙ্গল লাগোয়া চারটি রিসর্ট ইকো সেনসিটিভ জোনের মধ্যে পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আগামীতে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা বিশেষ কমিটি নেবে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। গরুমারা বন্যপ্রাণী বিভাগের এডিএফও রাজীব দে বলেন, ‘সমীক্ষার রিপোর্ট আমরা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেব।’
