দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: টেটো-অটো হোক, বাস বা ট্রেকার। নির্দিষ্ট ‘টোল গেটে’ (Raiganj Unlawful Toll Gate) টাকা না দিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তবে এই টোল গেট কিন্তু প্রশাসন বা কোনও সড়ক কর্তৃপক্ষ বানায়নি। বানিয়েছে সিন্ডিকেট। যার মাথায় আবার বসে রয়েছেন তৃণমূলের নেতা বা তাঁদের অনুগামীরা। তবে রাজ্যে পালাবদলের পর রায়গঞ্জের এই তোলাবাজির ছবিটাও বদলাচ্ছে। বিজেপি সরকার এমন অবৈধ টোল গেট বা তোলাবাজির বিরুদ্ধে কড়া নীতি নিয়েছে। সেইমতো রায়গঞ্জেও নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ ও প্রশাসন।
ইতিমধ্যেই গত রবিবার এই তোলাবাজি নিয়ে সরব হয়েছিল রায়গঞ্জের (Raiganj) অটোচালকদের একাংশ। অভিযোগ করেছিল, নির্ধারিত পার্কিং ফি ছাড়াও প্রতিদিন তাদের একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হত তৃণমূলের নেতাদের। খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, রায়গঞ্জ শহরের পুর বাসস্ট্যান্ড, শিলিগুড়ি মোড় সহ হেমতাবাদ, ইটাহার ও কালিয়াগঞ্জেও এমন তোলাবাজদের রাজত্ব হইহই করে চলছিল। তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা টোটো, অটো, ট্রেকার ও বাসকর্মীদের থেকে প্রতিদিন তোলা তুলছেন।
রায়গঞ্জের শিলিগুড়ি মোড় এলাকায় যেমন এমন একটি তোলাবাজির ঠেক ছিল। সেখানে ‘টোল গেট’ চালাতেন জনৈক সরকারবাবু আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা। অভিযোগ বাস মালিকদের। বিজেপি জেতার পর তাতে ভাটা পড়লেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাসচালকরা জানিয়েছেন, বুধবারও সরকারবাবুর লোকজন সেখানে বাসপ্রতি ২০ টাকা করে নিয়েছেন। বাস ও মিনিবাস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক প্লাবন প্রামাণিক বাসস্ট্যান্ড ও শিলিগুড়ি মোড় এলাকায় এই বেআইনি সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন। অন্যদিকে, তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের জেলা সভাপতি রামদেব সাহানি দায় এড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘রায়গঞ্জ ও ইটাহারে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কয়েকজন তৃণমূল কংগ্রেসের নাম করে টাকা তুলেছে। কালিয়াগঞ্জেও এমনটা হয়েছে। এরা দলের কেউ না।’ রামদেবের দাবি, ‘আমি দায়িত্ব পেয়ে এইসব বন্ধের জন্য চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি। আমি চাই এইসব বেআইনি টাকা আদায় বন্ধ হোক।’
বিষয়টি নিয়ে এদিন মহকুমা শাসক ও বিডিওদের নিয়ে বৈঠক করেছেন জেলা শাসক বিবেক কুমার। বৈঠকে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনও টোল গেট বা বেআইনি অর্থ আদায় চলতে দেওয়া হবে না। যেসব এলাকায় বেআইনি অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে দ্রুত অভিযান চালাতে হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে বিডিও ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের। পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গেও সমন্বয় রেখে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা শাসক বলেন, ‘বেআইনিভাবে রাস্তা আটকে টাকা আদায়, পণ্যবাহী গাড়ি থেকে জোর করে টোল তোলা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানির একাধিক অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এদিনের বৈঠকে। কোনও বেআইনি কাজ করা চলবে না। সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে যারা সিন্ডিকেটরাজ চালাবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করবে প্রশাসন।’
টোটো-অটো বা যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী গাড়ি থেকে জোর করে অর্থ আদায় বন্ধ করার পাশাপাশি পুকুর বা জলাশয় ভরাটের যে সিন্ডিকেট চলছে, সেসব বন্ধেও কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। পাশাপাশি যারা এই বেআইনি কাজে এতদিন মদত দিয়েছে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ চলছে। শাসকদলের যুব নেতা ও প্রাক্তন কাউন্সিলারদের নাম এসব কাণ্ডে জড়িয়ে গিয়েছে। সেইসঙ্গে উত্তর দিনাজপুর জেলাজুড়ে জাল লটারির টিকিটের সিন্ডিকেট ভাঙতেও উদ্যোগী হয়েছে পুলিশ। রায়গঞ্জ পুলিশ জেলার সুপার সোনাওয়ানে কুলদীপ সুরেশ বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ ও শহর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু চক্র বেআইনিভাবে টোটো, অটো থেকে অর্থ আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি তোলা আদায়, পুকুর ভরাট ও বেআইনি লটারির কারবার চালিয়েছে একশ্রেণির মানুষ। লাগাতার ধরপাকড় শুরু হয়েছে। কাউকে ছাড়া হবে না।’
