রাহুল দেব, রায়গঞ্জ : মাইক্রোমনোস্পরা শ্যামাপ্রসাদি। কি নামটা কানে কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছে তো? এটি একটি ব্যাকটিরিয়ার নাম। তুঁত গাছের মূলে থাকে। সদ্যই এর খোঁজ পেয়েছেন গবেষকরা। আর নামকরণে রয়েছে বাঙালি ছোঁয়া। ‘শ্যামাপ্রসাদি’র শ্যামাপ্রসাদ অংশটুকু তো এসেছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম থেকে। আর শ্যামাপ্রসাদের জন্মদিনের প্রাক্কালে সদ্য খোঁজ পাওয়া ব্যাকটিরিয়ার এহেন নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে রায়গঞ্জের নাম।
কীভাবে? রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরিকালচার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ অমিতকুমার মণ্ডল ও তাঁর টিম এই ব্যাকটিরিয়া খুঁজে পাওয়ার পেছনে এবং এর নামকরণের পেছনে রয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে নিরলস গবেষণার পর অবশেষে তাঁরা এই সাফল্য পেয়েছেন।
আর এই নামকরণে সিলমোহর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা সেককোড। এই প্রজাতির ব্যাকটিরিয়া থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্যকরী অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী গবেষক দল।
কোথায় এতদিন ‘লুকিয়েছিল’ এই ব্যাকটিরিয়া? গবেষকরা জানিয়েছেন, তুঁত গাছের মূলের চারপাশের মাটির অংশ (রাইজোস্ফিয়ার) থেকে এই নতুন প্রজাতির ব্যাকটিরিয়াটিকে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা। বিজ্ঞান মহলে ‘মাইক্রোমনোস্পরা’ গণটি বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ও জীবনদায়ী উৎসেচক তৈরির জন্য অত্যন্ত পরিচিত। ফলে আগামীদিনে চিকিৎসাক্ষেত্রে এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আশা অমিতদের। এই গবেষণায় অমিত ছাড়াও শামিল ছিলেন পঙ্কজ মণ্ডল, ঋত্বিক মণ্ডল, শুভজিৎ সাউ, দীপাঞ্জন দাস, রোহিণী থাপা ও সাগ্নিক গুহ। পাশাপাশি সেরিকালচার বিভাগের অধ্যাপক প্রদীপকুমার দাস মহাপাত্র, দেবনির্মাল্য গঙ্গোপাধ্যায়, আবদুল সাদাত, তন্ময় চৌধুরী এবং উপাচার্য ডঃ অর্ণব সেনের অবদানও অনস্বীকার্য। যে মাটি থেকে এই ব্যাকটিরিয়া মিলেছে, তার সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাটির এক গভীর আবেগের যোগসূত্র টেনেছেন প্রধান গবেষক অমিত। তাঁর কথায়, ‘এই মাটি সেই মাটিকে প্রতিনিধিত্ব করে যা রক্ষার জন্য শ্যামাপ্রসাদ আজীবন সংগ্রাম করেছিলেন।’
গবেষকরা বলছেন, নতুন এই ব্যাকটিরিয়া থেকে উপকারী অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়েছে বলেই এর চারপাশে অন্য কোনও ব্যাকটিরিয়া তৈরি হতে পারেনি। তাই আগামীদিনে কৃষিক্ষেত্রে এর সুপ্রভাব লক্ষ করা যাবে। ‘আবার এই ব্যাকটিরিয়া থেকে শুধু অ্যান্টিবায়োটিককে যদি আলাদা করা যায়, সেক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানেও অভূতপূর্ব সাড়া মিলবে,’ বলছেন অমিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত উপাচার্য ডঃ অর্ণব সেন। গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘খুব সুন্দর কাজ করেছেন গবেষকরা। ভীষণ উপকারী একটি ব্যাকটিরিয়া আবিষ্কার করেছেন তাঁরা। এই ব্যাকটিরিয়াকে বিভিন্ন উপায়ে গঠনমূলক কাজে লাগানো সম্ভব। যেহেতু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পক্ষ চলছে এই মুহূর্তে, সেহেতু তাঁর নামানুসারেই এই নামকরণ হয়েছে।’
কয়েক মাস আগে এই অমিত ও তাঁর সহযোগী গবেষকরাই আরও একটি ব্যাকটিরিয়ার নামকরণে স্মরণীয় করে রেখেছিলেন রায়গঞ্জকে। এবার মাইক্রোমনোস্পরা শ্যামাপ্রসাদি তাঁদের সাফল্যের শিরোপায় নতুন পালক যুক্ত করল।

