দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: নদী পেরোলেই শহর অথচ বছরের পর বছর ধরে বাঁশের মাচা অথবা সেতু দিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ কংক্রিটের সেতুর দাবি আজও পূরণ হয়নি। এই অবস্থায় একমাত্র ভরসা ৮০ বছরের গিরিলাল পাশমান। তিনি গ্রামের মানুষের সারাবছরের নদী পারাপারের ব্যবস্থা করেন। বর্ষার সময় নৌকায় এবং অন্যসময় নদীতে বাঁশের মাচা তৈরি করে যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন। এজন্য কেউ হয়তো পাঁচ টাকা দেন আবার অনেকে না দিয়েই পারাপার করেন। আবেগতাড়িত গলায় গিরিলাল বলেন, ‘আমি মারা গেলে এই ঘাট বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ এই ঘাটের ডাক হয় না। আমি গ্রামের মানুষের জন্য এই ঘাট ধরে রেখেছি।’ প্রায় দশ বছর আগে গিরিলালের স্ত্রী সুধামা সাপের ছোবলে মারা যান। তারপর থেকে দিনের অধিকাংশ সময় তাঁর নদীতেই কাটে। বাড়িতে চার ছেলে এবং বৌমা থাকলেও নদী তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
রায়গঞ্জ (Raiganj) শহর লাগোয়া কুলিক নদীর বন্দর আদি কালীবাড়ি গুজার ঘাটে সেতু না থাকায় প্রতিদিন কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। প্রতিদিন শহরে আসার জন্য কমপক্ষে দু’বার বাঁশের মাচা অথবা নৌকা করে নদী পারাপার করতে হয়। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এভাবেই চলছে। রায়গঞ্জ পুরসভা যাতায়াতের সুবিধার জন্য কংক্রিটের ঘাট করে দিলেও কংক্রিটের সেতু তৈরি হয়নি। রায়গঞ্জ পুরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডে বন্দর শ্মশান লাগোয়া এই ঘাটটির ওপারে ১০ নম্বর মাড়াইকুড়া গ্রাম পঞ্চায়েত। কাটাবাড়ি-নসরতপুর সংসদে রয়েছে ভিটিয়ার, ভাতঘরা, ঘোষপাড়া, পালপাড়া সহ একাধিক গ্রাম। সেখানকার মানুষকে দিনে অন্তত দুই-তিনবার নদী পারাপার করতে হয়।
সেকারণে গ্রামের বাসিন্দাদের পাশাপাশি পঞ্চায়েতের সদস্যরাও দীর্ঘদিন ধরে সেতুর জন্য রায়গঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির কাছে আবেদন জানিয়েছেন, এমনকি বিধায়ককেও জানিয়েছেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছুই মেলেনি। নসরতপুর-কাটাবাড়ি গ্রামের নির্মলা পাশমান পেশায় পরিচারিকা, প্রতিদিন সকালে নদী পার হয়ে এপারে কাজ করতে আসেন, আবার দুপুরে ফিরে যান। তিনি জানান, সেতু না হলে গিরিলালের অনুপস্থিতিতে আগামীতে ঘাটটি বন্ধ হয়ে যাবে। একই দাবি আরেক পরিচারিকা ভারতী ঘোষেরও।
ঘোষপাড়ার বাসিন্দা দুধ ব্যবসায়ী বাবলা ঘোষের কথায়, ‘এই ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের অনেকটা ঘুরে শহরে আসতে হবে। গিরিলাল দুপুরে বা বিশেষ কোনও কাজে বাড়িতে গেলে বর্ষার সময় আমাদের খুব সমস্যা হয়।’ বন্দর এলাকার রামপ্রসাদ চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরীরা জানান, কয়েকদিন আগে সেতুর ব্যাপারে বিধায়ককে জানানো হয়েছে। তিনি কথা দিয়েছেন করে দেবেন।
রায়গঞ্জ পুরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডের কোঅর্ডিনেটর তপন দাস বলেন, ‘নদীর ওপারের মানুষের যাতায়াতের জন্য রায়গঞ্জ পুরসভা কংক্রিটের ঘাট ও রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে। ছোট কংক্রিটের সেতু হয়ে গেলে আর কোনও সমস্যা থাকবে না।’ অন্যদিকে, মাড়াইকুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের নসরতপুর-কাটাবাড়ি সংসদের সদস্য মুসলিম আলি জানান, গুজার ঘাটে সেতুর জন্য তাঁরা পঞ্চায়েত সমিতির কাছে আবেদন জানিয়েছেন। সেতুটি খুবই দরকার।
