উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: ওডিশার (Odisha) পুরীর শ্রীজগন্নাথ ধাম (Puri Jagannath Temple) শুধু এক পরম পবিত্র তীর্থক্ষেত্রই নয়, বরং বহু অমীমাংসিত রহস্যের এক জীবন্ত খনি। প্রতি বছর রথযাত্রার পুণ্য তিথিতে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ভক্তের সমাগম ঘটে এখানে। ২০২৬ সালের রথযাত্রার এই মহা আবহে মহাপ্রভুর অলৌকিক মহিমা নিয়ে আবারও দেশজুড়ে চর্চা শুরু হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরের অজস্র বিস্ময়কর রহস্যের মধ্যে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো— মন্দিরের ভেতরে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাওয়া।
ভৌগোলিক দিক থেকে পুরীর (Puri) মূল জগন্নাথ মন্দিরটি বঙ্গোপসাগর থেকে তিন কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত। স্বাভাবিক নিয়মেই মন্দিরের বাইরে দাঁড়ালে সমুদ্রের উত্তাল গর্জন অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালোভাবে শুনতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার অর্থাৎ ‘সিংহদ্বারে’ পৌঁছানো পর্যন্ত সমুদ্রের ঢেউয়ের আওয়াজ কানে আসে। কিন্তু অলৌকিক বিষয় হলো, যেই মুহূর্তে কোনও ভক্ত সিংহদ্বারের চৌকাঠ পেরিয়ে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং গর্ভগৃহের (গর্ভগৃহ) দিকে এগিয়ে যান, অমনি সমুদ্রের সেই চেনা গর্জন এক লহমায় যেন কর্পূরের মতো উবে যায়। গর্ভগৃহে প্রবেশ করার পর চারপাশ সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ মনে হয়। আবার মন্দির থেকে বাইরে পা রাখামাত্রই সেই শব্দ ফিরে আসে।
এই অবিশ্বাস্য ঘটনার পেছনে বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার এক অদ্ভুত টানাপোড়েন রয়েছে। যদিও এই ঘটনার পেছনে কোনও সুনির্দিষ্ট বা সরকারিভাবে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই, তবে স্থপতি এবং শব্দবিজ্ঞানীদের (Acoustic Consultants) একাংশের মতে, এর মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে মন্দিরের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে। তাঁদের ধারণা, মন্দিরের বিশাল ও পুরু পাথরের দেওয়াল, বহুতল বিশিষ্ট সুউচ্চ কাঠামো, চারপাশের ঘেরা প্রাঙ্গণ এবং প্রবেশপথের বিশেষ নকশার কারণে বাইরের শব্দতরঙ্গ ভেতরে পৌঁছানোর আগেই শোষিত বা বাধাপ্রাপ্ত হয়। কিছু গবেষকের মতে, মন্দিরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং চারপাশের বাতাসের অভিমুখ এমন এক ‘অ্যাকোস্টিক ইফেক্ট’ বা শব্দ-নিরোধক পরিবেশ তৈরি করে, যা সমুদ্রের গর্জনকে গর্ভগৃহ পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয় না।
তবে বিজ্ঞান যেখানে কার্যকারণ খোঁজে, ভক্তের বিশ্বাস সেখানে অলৌকিকতায় আশ্রয় নেয়। স্থানীয় লোকগাথা ও পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, সমুদ্রের এই অবিরাম গর্জন মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল। প্রভুর এই কষ্টের কথা জানতে পেরে তাঁর পরম ভক্ত পবনপুত্র হনুমান সমুদ্রকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। বিশ্বাস করা হয় যে, মহাবীর হনুমান আজও পুরীর মন্দিরের চারদিকে এক অদৃশ্য সুরক্ষাকবচ বা শব্দ-প্রাচীর তৈরি করে রেখেছেন, যা সমুদ্রের তীব্র শব্দকে মন্দিরের পবিত্র শান্ত পরিবেশের ভেতরে ঢুকতে দেয় না। বিজ্ঞান নাকি ভক্তি— এই রহস্যের শেষ কোথায়, তা আজও এক পরম বিস্ময়।

