সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি: এক কিলোগ্রাম তেলের দাম নাকি এক হাজার টাকা- সম্প্রতি বড়গাছি হাটে এমনটা শুনে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার অবস্থা মনোরঞ্জন সাহার। বাড়ি কুশমণ্ডিতে হলেও থাকেন কালিয়াগঞ্জের ডালিমাগাঁও গ্রামে। তাঁর অবস্থা দেখে তেল বিক্রেতা (Pure Mustard Oil) নুর ইসলাম (Nur Islam) বলে উঠেন, ‘আরে মশাই ঘানির সর্ষের তেল। দরদামের কোনও সুযোগ নেই।’ কুশমণ্ডি ব্লকের মালিহার বনগাঁ গ্রামে নুর ইসলামের বাড়ি। তিনি জানান, প্রতি শুক্রবার সকালে গাছ বাহি অর্থাৎ ঘানি গোরু দিয়ে টানিয়ে সর্ষে থেকে তেল বের করেন (Conventional Ghani)। এইভাবে তিন পুরুষের পরম্পরা টিকিয়ে রেখেছেন তিনি। নুরের কথায়, ‘১ হাজার টাকায় ১ কেজি তেল বিক্রি করে যে লাভ হয় সেটা বলার মতো নয়। পাঁচ কেজি সর্ষে ঘানিতে ঘুরিয়ে তেল বেরোয় ১ কেজি ২০০ গ্রাম। সকাল ৭ টায় ঘানি শুরু হলে ৫ কেজি সর্ষে ভাঙতে দুপুর গড়িয়ে যায়। সর্ষের দাম, গোরুর খাওয়া খরচ আর নিজের পরিশ্রমের হিসেবে যেটা নেহাতই কম।’
বাবা দবিরদ্দিন আহম্মেদের কাছে শিখে এখন নিজে হাতে ঘানি চালান নুর। সেই ঘানির তেল বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে যান কবিরাজ থেকে শুরু করে সদ্যোজাত শিশুর বাবারা। এছাড়াও তেল বিক্রি করেন কুশমণ্ডি ব্লকের বিভিন্ন হাটে। রায়গঞ্জ থানার টুঙ্গিদিঘির গ্রামীণ কবিরাজ আফেলদ্দিন আহম্মেদের কথায়, ‘শরীরের নানা অংশের ব্যথার জন্য ঘানির তেলের বিকল্প নেই।’ কুশমণ্ডির রাম নন্দী জানালেন, বেশকিছুদিন খোঁজাখুঁজির পর ঘানির তেলের খোঁজ পান। একদিন সকালে নুর ইসলামের বাড়িতে গিয়ে সমস্তকিছু দেখে এসেছেন। তাই দাম নিয়ে তাঁর কোনও সংশয় নেই। ঠান্ডার সময় ঘানির তেলের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। অনেকেই মুড়ির সঙ্গে এমনকি গরম ভাতে প্রথমে সর্ষের তেল ছিটিয়ে একদলা ভাত মুখে দিয়ে পরে তরকারির দিকে হাত বাড়ান। ঊষাহরণ গ্রামের ফণীন্দ্রনাথ বসাক কথায় কথায় জানালেন, ‘আমরা কৃষক মানুষ। ভাতের পাতে নুন আর সর্ষের তেল অবশ্যই চাই। ঘানির তেলের দাম অনেক বেশি বলে বাজার থেকে কেনা সর্ষের তেল দিয়ে সেই স্বাদ মেটাই।’
শীতের তুলনায় গরমের সময় চাহিদা কমে আসে। সর্ষে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নির্ভেজাল সর্ষের ঘানির তেল তৈরি করা নুর ইসলাম সমাজে তেলি বা কলু নামে পরিচিত হয়েছেন ছোটবেলায়। তাঁর ছোট্ট ছেলেও ধরে রাখবে এই পরম্পরা সেব্যাপারে তিনি নিশ্চিত বলে জানালেন নুর। তিনি জানান, প্যাকেটজাত নানা কোম্পানির সর্ষের তেল বর্তমানে বাজারে পাওয়া গেলেও এবং সেসবের দাম অনেক কম হলেও কলুর বলদের ঘানিতে ভাঙা সর্ষের তেলের বিকল্প এখনও আসেনি।
