- শুভঙ্কর চক্রবর্তী
গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে ‘শূন্য পাওয়া বিডিও’ লিখলেই জ্বলজ্বল করে ওঠে প্রশান্ত বর্মনের নাম (Prashanta Barman)। উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক অলিন্দে নামটি গত কয়েক বছরে কেবল একজন বিডিও’র পরিচয় ছাপিয়ে এক মূর্তিমান ত্রাসের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। বারেবারে ক্ষমতার দম্ভ এবং দুর্নীতির অশুভ আঁতাতের অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে পাশ করার যে অভিযোগ দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা, কালচিনির বিডিও থাকাকালীন তা ডালপালা মেলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছিল। পরীক্ষায় জালিয়াতি থেকে শুরু করে খুনের মামলা, সর্বত্রই তাঁর দাপুটে বিচরণ আইনের শাসনকে উপহাস করেছে। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে প্রশান্ত ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিলেন। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, ক্ষমতাশালী প্রশান্তকে ছুঁতে পারবে না কেউই। সোমবার হাইকোর্টের নির্দেশে তাঁর জামিন খারিজ হওয়া সেই ধারণায় বদল আনবে।
সচরাচর দেখা যায় আমলারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা মেনে চলেন, কিন্তু প্রশান্তর ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। খোদ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মিথ তৈরি করে, ফোনে লাউডস্পিকার অন করে কথোপকথন শোনানোর মতো ধৃষ্টতা দেখিয়ে তিনি শাসকদলের তাবড় নেতাদেরও কুক্ষিগত করে ফেলেছিলেন। তাঁর এক ইশারায় যখন আলিপুরদুয়ারের পাশাং লামার মতো প্রভাবশালী নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে প্রশান্ত কেবল একজন সরকারি আধিকারিক নন, বরং তিনি ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে এক সমান্তরাল শক্তি। তাই শাসকদলের নেতারাও প্রশান্তকে সমঝে চলতেন। অনেক কথা জানলেও কখনই সেসব বলার সাহস দেখাননি তাঁরা। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক মহলে প্রশান্তকে বলা হয় তৃণমূলের ‘খবরিলাল’। উত্তরবঙ্গের নেতাদের নানা কাজকর্ম এবং গোপন খবর তিনি নাকি পৌঁছে দিতেন শাসকদলের শীর্ষ মহলে। ফলে শুধু নেতা নন, পাছে কলকাতায় কলকাঠি নাড়েন সেই ভয়ে প্রশান্ত ফোবিয়ায় ভুগতেন অনেক মন্ত্রীও।
জেলায় জেলায় থাকা প্রশান্তর আধডজনের বেশি বিলাসবহুল বাড়ি এবং বিপুল সম্পত্তির কথা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। তা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপ না হওয়ায় আইনের শাসনের কঙ্কালসার চেহারাটি বারবার সামনে এসেছে। সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, মাথার ওপর অত্যন্ত প্রভাবশালী কোনও ‘ছায়ার’ আশীর্বাদ না থাকলে একজন বিডিও’র পক্ষে খুল্লম খুল্লা ক্ষমতার প্রদর্শন সম্ভব নয়। তাই প্রশান্ত যাই করুন না কেন তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ হবে না। সেই ধারণা অবশ্য এমনি এমনি তৈরি হয়নি৷ নানা ঘটনার প্রেক্ষিতেই তা বদ্ধমূল হয়েছে। তাই খুনের প্রধান আসামি হয়েও তাঁর বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো, গ্রেপ্তার না হওয়া বা জামিন পেয়ে যাওয়ায় খুব একটা অবাক হয়নি আমজনতা। এতকিছুর পরেও স্বঘোষিত ‘দাবাং বিডিও’ হিসাবে নিজেকে জাহির করার চেষ্টার মধ্যেও যে দম্ভ প্রকাশ পেয়েছিল তা অবাক করেছে অনেক দুঁদে আমলা বা পুলিশকর্তাদেরও।
তবে সোমবার হাইকোর্ট তাঁর জামিন খারিজ করে দিয়ে যে কড়া বার্তা দিল, তা সাধারণ মানুষের মনে আইনের শাসনের প্রতি খানিকটা হলেও ভরসা বৃদ্ধি করবে। অন্যায় করলে শেষরক্ষা যে হয় না, সেই সত্যটিই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হল- প্রশান্তর জামিন খারিজের খবর চাউর হওয়ার পর সব মহলে এটাই ছিল প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া।
প্রশাসনের অন্দরমহল থেকে রাজনৈতিক মঞ্চ—সবাই যখন প্রশান্তর প্রতাপে কার্যত নতজানু, তখন ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’ শুরু থেকেই নির্ভীকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা নানা খতিয়ান জনসমক্ষে এনেছে। নানাবিধ হুমকি ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ধারাবাহিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে গিয়েছে। প্রতিবেদন বন্ধের জন্য কোনও চাপের কাছেই মাথা নোয়ায়নি উত্তরের প্রিয় পত্রিকা।
প্রশান্তকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এরপর প্রশান্ত হয়তো সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন। আইন এবং বিচার ব্যবস্থা তার নিজস্ব পদ্ধতিতেই এগিয়ে যাবে। কিন্তু সোমবার প্রশান্তর দম্ভে যে চপেটাঘাত করল হাইকোর্ট, নিশ্চিতভাবেই তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এরপর প্রশান্তর জীবন ও কার্যকলাপের উপর আরও জোরালো আলো পড়বে, নানা রহস্য থেকে পর্দা উঠবে- তা যে বিডিও’র পক্ষে সুখকর হবে না সেটা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছেন আমলাদের একাংশই। শুধু আমজনতা বা নেতাদেরই নয়, আমলা ও পুলিশের একাংশকেও এতদিন ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছেন প্রশান্ত। ফলে সরকারি কর্মী মহলেও তাঁর বিরুদ্ধে যথেষ্ট ক্ষোভ আছে। সুযোগ পেলে কেউই যে ছেড়ে কথা বলবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অপরাধবিজ্ঞান বলে, অপরাধী তার অপরাধের কোনও না কোনও প্রমাণ দিয়ে থাকে। অপরাধবিজ্ঞানে ‘অহংকারী অপরাধী’র কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা অপরাধ করার পর অনুতাপ-এর বদলে দম্ভ দেখায়। বিজ্ঞানের সেই নীতিতেই প্রশান্ত ফেঁসে গিয়েছেন বলেই মনে করছেন অপরাধবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করা মনস্তাত্ত্বিকরা।
এত কিছুর পরেও প্রশান্তর ক্ষমতার আসল উৎসটি আজও রহস্যাবৃত। সেই উৎসের খোঁজে অনুসন্ধান চলবে।
