শুভঙ্কর চক্রবর্তী : সদ্য প্রাক্তন অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল জয়জিৎ চৌধুরীর সঙ্গে পলাতক বিডিও প্রশান্ত বর্মনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে জলঘোলা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। প্রশান্তর সঙ্গে জয়জিৎ-এর রসায়ন নিয়ে তদন্তের দাবিও উঠেছে। বিডিও থাকাকালীন নিয়ম ভেঙে জয়জিৎ-এর আইন কলেজ থেকেই আইনের ডিগ্রি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল প্রশান্তর বিরুদ্ধে। আলিপুরদুয়ারের কালচিনির বিডিও থাকাকালীন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন জয়জিৎ-এর শিলিগুড়ির মাটিগাড়ার আইন কলেজ থেকে তিন বছরের এলএলবি (রেগুলার কোর্সে) ডিগ্রি পেয়েছিলেন প্রশান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুসারে রেগুলার কোর্সে পরীক্ষায় বসার জন্য ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তিন বছরে এজন্য প্রশান্ত ছুটি নেননি। তাহলে কি প্রতিদিন বিডিওর নির্দিষ্ট প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করার পর ১৫০ কিলোমিটার দূর থেকে জাদুবলে মাটিগাড়ার কলেজে এসে ক্লাস করতেন প্রশান্ত? সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। যদি ক্লাসে উপস্থিত না হন তাহলে কেন তিনি পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেলেন আর কীভাবেই বা ডিগ্রি পেলেন তা রহস্যময়।
শুধু এলএলবি নয়, একই কলেজে এলএলএম কোর্সেও ভর্তি হয়েছেন প্রশান্ত। এসবের মধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে জয়জিৎ-এর প্রশান্তকে সংবর্ধনা দেওয়ার বেশকিছু ছবি ও ভিডিও। তার জেরে দুজনের সম্পর্ক নিয়ে জল আরও ঘোলা হয়েছে। যে আলিপুরদুয়ার বিএড কলেজ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন জয়জিৎ সেই কলেজেই জাঁকজমক করে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল প্রশান্তকে। আলিপুরদুয়ার বিএড কলেজটি আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের তপসিখাতায় অবস্থিত। যখন সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে তখন প্রশান্ত কালচিনির বিডিও ছিলেন। সংবর্ধনার জন্য কলেজজুড়ে প্রশান্তর বিশাল বিশাল কাটআউট লাগানো হয়েছিল। সেই সময় প্রশান্তই ছিলেন জেলা প্রশাসনের কার্যত শেষকথা। প্রভাবশালী ওই বিডিওর ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতেন জেলার শীর্ষস্থানীয় আমলারাও। কলেজ নিয়ে আইনি জটিলতা চলার সময় প্রশান্তকে নিয়ে এসে সংবর্ধনা দিয়ে জয়জিৎ নিজের ক্ষমতা জাহির করতে চেয়েছিলেন কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে।
এবিষয়ে জয়জিৎ-এর বক্তব্য অবশ্য জানা যায়নি। একাধিকবার তাঁকে ফোন করা হলেও তিনি কোনও কারণে ফোন তোলেননি। বক্তব্য জানতে চেয়ে মেসেজ করা হলেও উত্তর দেননি। তৃণমূল ঘনিষ্ঠ জয়জিৎ অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল হিসাবে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন। প্রশান্তর ক্ষমতার কথা কারও অজানা নয়। তাই এতদিন বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি। তবে রাজ্যে ক্ষমতা পরিবর্তন হতেই প্রশান্তর সঙ্গে জয়জিতের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশান্তর ডিগ্রি পাওয়ার ঘটনায় উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন আধিকারিকের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। কীভাবে একজন কর্মরত বিডিওকে নিয়ম ভেঙে পরীক্ষায় বসার ছাড়পত্র দেওয়া হল তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। গোটা বিষয়টির উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে।
সূত্রের খবর ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে রাজ্য দুর্নীতিদমন কমিশনের কাছেও অভিযোগ জমা হয়েছে। হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের বিশিষ্ট আইনজীবী সন্দীপ মণ্ডলের বক্তব্য, ‘বিভিন্ন বিষয়ে এখনও পর্যন্ত যেসব তথ্য উঠে এসেছে তা ভয়ংকর। উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গড়ে প্রত্যেকটা বিষয়ের তদন্ত হওয়া উচিত। প্রশান্ত বর্মন ক্লাস করেছিলেন কি না, পরীক্ষা দিয়েই ডিগ্রি পেয়েছিলেন কি না- সবটাই খতিয়ে দেখা দরকার। আইন ভেঙে প্রশান্তকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইননানুগ কড়া পদক্ষেপ করা উচিত। তা না হলে সাধারণ মানুষের প্রতি আইনজীবী এবং আইন শিক্ষা নিয়ে মারাত্মক ভুল বার্তা পৌঁছাবে।’

